তেলোভেলোর ডাকাত কালী

Life24 Desk   -  

গৌতম বিশ্বাস

একবার ঠাকুরের অসুখের খবর পেয়ে কামারপুকুর থেকে মা সারদা পায়ে হেঁটে দক্ষিণেশ্বরে যাচ্ছেন। সঙ্গে রয়েছেন ভূষণ মণ্ডলের মা সহ আরো কয়েকজন মহিলা। কামারপুকুর থেকে আরামবাগ আট মাইল।তারপরেই পড়ে তেলোভেলোর মাঠ। আর তার কয়েক মাইল পরেই তারকেশ্বর।তখন তেলোভেলোর মাঠ ছিল ডাকাত দলের ঘাঁটি। তেলো আর ভেলো হল পাশাপাশি দুটি গ্রাম। এর বর্তমান অবস্থান নবনির্মিত তারকেশ্বর-আরামবাগ রেলপথের মায়াপুর স্টেশন থেকে মাত্র একমাইল দূরে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকেও তেলোভেলোর জঙ্গল দেখা যায়। মা সারদা ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকে দেখার জন্য কামারপুকুর থেকে যাত্রা শুরু করলেন।আট মাইল হেঁটে আরামবাগ পৌঁছে পা দুটি বড্ড ক্লান্ত হল। টন্ টন্ করতে লাগল। বয়স বেশি নয়, হয়তো তখনও আঠারো পেরোয়নি। মা সারদা সঙ্গীদের বললেন, একটু বিশ্রাম নিলে হয় না। পা দুটি তো আর চলতে চায় না। সঙ্গীদের তখন অন্য ভয়। সূর্য ডোবার আগে তোলোভেলোর মাঠ পেরিয়ে যেতে না পারলে ডাকাতদের কবলে পড়তে হবে। তাই তাঁরা তাড়া দেয়, একটু পা চালিয়ে চলো তো বাপু।তাঁদের কথা শুনে মা সারদা অত্যন্ত নিরুপায় হয়ে পা দুটি টেনে টেনে কোনমতে চলতে লাগলেন। তবুও তিনি বারবার পিছিয়ে পড়েন।সঙ্গীরা বিরক্ত হয়ে বলে, বেলা যে ঢলে এলো, আর একটু জোরে পা চালিয়ে চলো না বাপু। শেষকালে ডাকাতের হাতে মারা পড়ব নাকি। এদিকে সূর্য অস্তাচলে।দয়াময়ী মা সারদা তাই সঙ্গীদের বললেন, তোমরা আর আমার জন্য দাঁড়িয়ো না। তারকেশ্বরে গিয়ে ওঠো সেখানেই তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে। তাঁর কথা শুনে পরিজনেরা ডাকাতের ভয়ে সারদাকে একা রেখে এগিয়ে গেল। জনমানুষহীন অন্ধকার প্রান্তরে মা তখন একা।পায়ে ব্যথা, শরীরেও তেমন বলও আর পাচ্ছেন না। তবুও তিনি একাকী অতি কষ্টে অন্ধকার অচেনা পথে হেঁটে চলেছেন। হঠাৎ অন্ধকার ভেদ করে কোথা থেকে চারদিক কাঁপিয়ে ভেসে এল হাড়-হিম করা এক গর্জন। কে যায় ?নিকষ কালো অন্ধকার ভেদ করে মায়ের সামনে লাঠি হাতে এসে দাঁড়াল কালো দৈত্যের মতো একজন। যেন হাওয়ার গতিতে এলো।মাথায় ঝাকড়া চুল, হাতে লোহার বালা, কপালে লম্বা লাল সিদুঁরের টিপ। তাকে আচমকা দেখে মা শিহরে উঠলেন।তিনি বুঝতে পারলেন ডাকাতের কবলে পড়েছেন।ডাকাত সর্দার ভীম কর্কশ গলায় জিজ্ঞাসা করল, তুই কে?  কোথায় যাচ্ছিস?

ভয়ংকর চেহারার ভীম ডাকাতকে দেখে মা সারদা একটুও বিচলিত হলেন না।বরং তিনি অত্যন্ত নির্ভয়ে শিশু সুলভ সরলতায় বললেন, তোমার মেয়ে গো বাবা— আমি সারদা। যাচ্ছি তোমার জামাইয়ের কাছে দক্ষিণেশ্বরে।

এই কথা শুনে হঠাৎ করে যে কি যে হয়ে গেল ডাকাত সর্দারের মনে। বিড়বিড় করে আপন মনে সে বলতে লাগল, আমার মেয়ে ? কই এত বছর ধরে ডাকাতি করছি, কেউ তো এমন মায়ায় ভরা স্বরে বাবা বলে ডাকেনি। ঠিক তখনই মিশমিশে অন্ধকার ভেদ করে ঠিকরে এল এক আলোর জ্যোতি।আলোয় ভরে গেল তোলোভেলোর মাঠ। মা সারদার পরনে ছিল লাল পেড়ে শাড়ি। কপালে রক্ত জবার মতো লাল সিদুঁরের টিপ। মাথায় নতুন বউয়ের মতো ঘোমটা টানা। তারই মধ্যে দেখল তাঁর আরাধ্যা দেবী মাকালীকে। সারদার মধুর কণ্ঠস্বর আরেকজনও শুনতে পেয়েছিল। সে হল ডাকাত সর্দারের স্ত্রী। সারদার কণ্ঠস্বর শুনে ছুটে এসে কাতর হয়ে মায়ের হাত দুটি ধরে বললে, কে মা তুমি?

সারদা বললেন, তোমার মেয়ে সারদা গো। চিনতে পারলে না।যাচ্ছিলুম দক্ষিণেশ্বর তোমার জামাইয়ের কাছে গো।রানি রাসমণির কালীবাড়ি। সঙ্গীরা সব এগিয়ে গেছে।আমি তো মা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম।ভাগ্যিই তোমরা এলে, তাই মনে ভরসা পেলুম।

কঠিন পাথর ফেটে যেন তরল হয়ে গেল। ডাকাতের স্ত্রী জোর করে সারদাকে নিয়ে গেল তাদের কুটিরে।তারপর কত যত্নআত্তি।ঘরে ছিল মুড়ি মুড়কি ও চালভাজা, তাই দিয়ে মেয়ে সারদাকে পরম আদরে খেতে দিলে ডাকাতের স্ত্রী। বিছানা পেতে দিলে মাটির দাওয়াতে।তৃপ্তি করে খেয়ে মা সারদা সেখানেই বড় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লেন।পরদিন ভোর হতেই ডাকাত সর্দার ভীম নিজে মাকে পৌঁছে দিলেন মায়ের সঙ্গীদের কাছে।বিদায়ের সময় বাঁধ ভাঙল আবেগের।যেন মেয়ে চলেছে শ্বশুরবাড়ি।চোখের জলের ধারা গাল বেয়ে ঝরে পড়তে থাকে কঠিন হৃদয়ের ডাকাত সর্দার ভীমের। যতদূর দেখা যায় ডাকাত বাবা চেয়ে থাকল মেয়ে সারদার চলে যাওয়ার পথের দিকে। বহু জন্মের পুণ্যফলে মা ভবতারিণী নিজে এসে ধরা দিলেন মেয়ের রূপ ধরে। এই মাকে প্রতিষ্ঠা করল ডাকাত ভীম সর্দার। মায়ের নিত্য ভোগের সঙ্গে এখনও দেওয়া হয়ে থাকে মুড়ি মুড়কি ও চালভাজা।

Spread the love

আপনার প্রিয় ওয়েব ম্যাগাজিন ‘Life24’-এ আপনিও লিখতে পারেন এই ম্যাগাজিনের উপযুক্ত যে কোনও লেখা। লেখার সঙ্গে পাঠাবেন উপযুক্ত ২-৩টি ফটো। লেখা পাঠাবেন ইউনিকোডে টাইপ করে। ইউনিকোড ছাড়া কোনও লেখাই গ্রহণ করা হবে না। লেখা ও ফটো পাঠাবেন editor.life24@gmail.com আইডি-তে। কোন সেগমেন্টের লেখা পাঠাচ্ছেন, তা মেলের সাবজেক্টে অবশ্যই লিখে দেবেন। আর অবশ্যই মেলে আপনার নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর জানাবেন।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে খুব কম খরচে আপনার পণ্য কিংবা সংস্থার বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন। বিস্তারিত জানার জন্য মেল করুন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে ৩১ মার্চ পর্যন্ত আপনি একেবারেই বিনামূল্যে দিতে পারবেন শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন। এই বিভাগের যে কোনও সেগমেন্টের জন্য ৫০ শব্দের মধ্যে ইউনিকোডে লিখে মেল করে দিন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।  মেলের সাবজেক্টে লিখে দেবেন 'শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন'।

# 'Life24' ওয়েব ম্যাগাজিন বা এই ওয়েব ম্যাগাজিনের লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত লিখে জানান নিচের কমেন্ট বক্স-এ। আর হ্যাঁ, ম্যাগাজিনটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার পরিচিতদের।