দেশে ফিরেও কি স্বস্তিতে আছেন অভিনন্দন?

Life24 Desk   -  

ভাবুন আপনার বাড়ির ছেলে দেশকে রক্ষা করতে গিয়ে শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পরে তাদের জিম্মায় বন্দি রয়েছে। খবরটা শোনার পর আপনার পরিবারের সকলের কী পরিস্থিতি হবে। তারপর থেকে প্রতিটা মুহূর্ত কীভাবে কাটবে? সেটা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সেই শত্রপক্ষ ধরুন পাকিস্তান। আপনার ঘরের ছেলেকে তারা বন্দি করে তার রক্তাত্ব চেহারার ছবি সোশ্যাল মাধ্যমে ছড়িয়েও দিল। আপনার সন্তান দেশে ফিরতে পারবে কিনা তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তারপর দীর্ঘ চাপান-উতোর, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক পর্যায়ের আলোচনার পর যদিও বা নিশ্চিন্ত হলেন ঘরে ছেলে ঘরে ফিরবে, তখন আনন্দ যেমন হবে তেমন ছেলেকে দেখে, তার সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এত গেল যে ধরা পড়েছে তার বাড়ির লোকের কথা, কিন্তু যে বন্দি হয়েছে তার প্রতিটা মুহূর্ত কীভাবে কেটেছে সেটা কি ব্যক্ত করা আদৌ সম্ভব। যে এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে হয়তো সেই একমাত্র বুঝতে পারে অবস্থাটা। তার মনের উপর, শরীরের উপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যায়। দীর্ঘ মানসিক, শারীরিক লড়ায়ের পর কপাল জোরে দেশে ফিরতে পারলেও তার নিশ্চয় তখন পরিবারের লোকজনকে সবথেকে বেশি প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেটা কী আদৌ হয়?

এতগুলো কথা বলার কারণ একটাই। উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি হওয়ার পর থেকে তাঁকে দেশে ফেরানো নিয়ে কম চাপান-উতোর হয়নি। একদিকে অভিনন্দন পাকিস্তানি সেনাদের একের পর এক জেরার কাছে মাথা নত না করে সাহসিকতার সঙ্গে তাদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। এটা অবশ্যই সাহসীকতার পরিচয়। কিন্তু এই সাহসিকতাটা দেখানোর জন্য কতটা মানসিক শক্তির প্রয়োজন সেটা অভিনন্দনই জানেন। তিনি কোনওভাবেই দুর্বলতার পরিচয় দেননি। অন্য দিকে সেই সময় তাঁকে দেশে ফেরানোর সবরকম চেষ্টা করে চলেছে ভারত সরকার। অবশেষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যখন বৃহস্পতিবার জানালেন শুক্রবার অভিনন্দনকে দেশে ফেরানো হবে, তখন অভিনন্দনও নিশ্চয় খানিকটা স্বস্তি পেয়েছিলেন, তেমন নিশ্চিন্ত হয়েছিল তার পরিবার সহ গোটা দেশবাসী।

শুক্রবার বলা হয়েছিল অভিনন্দনকে বিকেল চারটের সময় ওয়াঘা সীমান্ততে আনা হবে। কিন্তু সেই সময় অতিক্রান্ত হয়ে রাত প্রায় নটা নাগাদ অভিনন্দন এলেন ওয়াখা সীমান্তে। সেখান থেকে ভারতীয় বায়ুসেনা তাঁকে নিজেদের হস্তগত করে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তাঁকে নিয়ে একটা ভিডিও করার কারণে এই বিলম্ব। ভাবুন যেখানে একটা মানুষ দেশে ফেরার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেখানে তাকে নিয়ে ভিডিও করা হচ্ছে। সেখানেও সতেরোবার টেক করা হয়েছে। গোটা দেশবাসী যখন তাঁর দেশ ফেরার উচ্ছ্বাসে আনন্দ করছে, তখন যাঁকে নিয়ে এত উচ্ছ্বাস তার কী পরিস্থিতি হচ্ছে। অভিনন্দন দেশে ফিরেছে এটা অবশ্যই আনন্দের খবর। অভিনন্দন নিজেও বলেছেন দেশে ফিরে ভালো লাগছে। কিন্তু দেশে ফেরার পরেও তাঁকে যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে, তাতে তাঁর মানসিক অবস্থা কী হচ্ছে সেটা কী কেউ ভেবেছেন?

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, অভিনন্দন এয়ার ফোর্সের সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে বসে রয়েছেন। গল্পগুজব করছেন। তাঁর সাহসীকতার জন্য সকলে তাঁকে নিয়ে ধন্য ধন্য করছেন। এরকমটা যদি ভেবে থাকেন, তাহলে ভুল ভাবছেন।

কারণ, এখন তাঁর সাড়া শরীরে খোঁজা হচ্ছে পাকিস্তানিরা তাঁর শরীরের কোথাও চিপ লাগিয়ে দিয়েছে কিনা। অভিনন্দন যতই বলুন, তাঁর শরীরে কোনও চিপ লাগানো নেই। কিন্তু কে বিশ্বাস করবে তাঁর কথা? পাকিস্তানি সেনা শিবিরে কাটিয়ে এসেছেন। তারপরও কি তাঁকে বিশ্বাস করা যায় নাকি? অতঃপর সন্দেহ দূর করতে তাঁর এই পরিস্থিতিতেই খোঁজা হোক পাকিস্তানিরা তাঁকে গুপ্তচর হিসাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে কিনা।

একটা মানুষ যেখানে এতটা লড়াই করে দেশে ফিরলেন, তারপর কি তাঁর এই ধরনের জেরার মুখোমুখি হওয়ার মতো মানসিক শক্তি থাকে? শুধু শরীরে চিপ আছে কিনা সেটা দেখা নয়। তাকে দিতে হবে ইন্টারভিউ। পুঙখানুপুঙখ বিবরণ দিতে হবে শত্রু শিবিরে কাটানো তাঁর প্রত্যেকটি মুহূর্তের। আর সেই কথোপকথন থেকে এক্সপার্টরা মেপে নেবেন সেখানে তাঁর মগজধোলাই হয়েছে কিনা, সে এখন পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করছে কিনা।

একদিকে দেশবাসী অভিনন্দনকে নিয়ে যখন গর্ব অনুভব করছে তখন এক কালকুঠরির মধ্যে নিজের বাহিনীর সামনে এই ধরনের অপমান হজম করতে হচ্ছে বীর সেনাকে। এই ধরনের সাদর অভ্যর্থনা হজম করার মতো এই মুহূর্তে কি প্রস্তুত অভিনন্দন? এই অভ্যর্থনার যন্ত্রণাটা যে কী সেটা বোধহয় অভিনন্দনই বুঝতে পারছেন। রাষ্ট্রীয় এই সাদর অভ্যর্থনাকে কী বলা হয় জানেন? “ডিব্রিফিং”, মানে মগজধোলাই।

এবার বুঝতে পারছেন বীর সেনাদের নিয়ে গর্ব অনুভব করলেও, যাঁদের নিয়ে গর্ব করা হয় তাঁদের কতটা মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। হায় রে অভিনন্দন! দেশে ফিরেও ঘরের ফেরার আনন্দটা থেকে এখনও বঞ্চিত। বড় কথা এই পাকিস্তানের সেনা শিবির থেকে বেঁচে ফিরে আসার পরও মানসিক স্বস্তি নেই। না জানি আর কতটা মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে দেশের এই বীর কমান্ডারকে।

Spread the love