বাংলা সাংবাদিকতা, অবনমন ঠেকাবে কে?

Life24 Desk   -  

জয় চক্রবর্তী

এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। বিশ্বকবির এই কথা আজও প্রতি ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই যেমন পৃথিবীর সর্ববৃহত গণতন্ত্র ভারতের সংবাদমাধ্যম-এর (গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ) পরিস্থিতির কথাই ধরুন না। সাধারণ মানুষ বা ছাত্রছাত্রীদের কাছে এর প্রভুত আকর্ষণ রয়েছে। কিন্তু যাঁরা এই পেশায় সঙ্গে যুক্ত তাঁরাই একমাত্র জানে কি চরম প্রতিকুলতার মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন কাজ করতে হয়। একদিকে রাজনৈতিক চাপ, তার সঙ্গে একই পেশার অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে প্রতিমুহূর্তে প্রতিযেগিতা (কখনও সেই প্রতিযোগিতা অসম লড়াই হয়ে দাড়ায়)। এছাড়াও ক্রাইম বা পলিটিক্যাল রিপোর্টারদের রয়েছে প্রাণের ঝুঁকি। তবে এই পর পর্যায়ে পৌঁছনোর আগেই অনেক প্রতিভা কুড়িতেই ঝড়ে যায়। ছাত্রাবস্থা থেকে এই পেশায় প্রবেশের প্রথম দিন থেকে যে প্রতিকুলতা আসে তা সহ্য করে খুব কম মানুষই এই পেশায় টিকে থাকতে পারে। আর বর্তমান বাংলা সংবাদমাধ্যম যে কাঁটা বিছানো পথ দিয়ে যাচ্ছে, তাতে এর ভবিষ্যত্ নিয়েই রীতিমতো সন্দীহান বরিষ্ট সাংবাদিকরা। আদৌ বাঁচবে তো বাংলা সংবাদমাধ্যম! নাকি ঐতিহ্য হারিয়ে তা সরকারের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হবে!

ভারতের সংবাদপত্র হিসাবে প্রথম হিকির বেঙ্গল গেজেট (১৭৮০) প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই শাসকের চাপে তা বন্ধ হয়ে যায় (দ্বিমতও রয়েছে)। সেই থেকে শুরু যা আজও চলছে। তবে স্বাধীনতা আন্দোলনে সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যমের এক অনন্য গুরুত্ব ছিল। শাসকের অত্যাচার সহ্য করে না খেতে পেয়ে মারা গেছেন এমন সাংবাদিকেরও উদাহরন রয়েছে বাংলায়। সেই সম্পাদকরাই ছিলেন সংবাদপত্রের মুখ, কিন্তু বর্তমান সম্পাদকরা শুধু ব্যবসা বোঝেন। ব্যবসার খাতিরে তারা নৈতিকতা বিসর্জন দিতে পিছপা হন না। যদি তা না দেন তাহলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক বাংলার সর্বাধিক জনপ্রিয় সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে এমন নজিরও দেখা গেছে। তা সত্বেও গত কয়েক দশকে সাংবাদিকতা এতটাই জনপ্রিয় পেশা হিসাবে উঠে এসেছে যে বিভিন্ন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই বিষয়ে পড়ান হচ্ছে। প্রতি বছর তাতে আসন সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে এই বিষয় নিয়ে পরার ক্রেজও। পাল্লা দিয়ে কাজের সুযোগও বাড়ছিল একটা সময়। চিটফন্ডের টাকায় রমরমিয়ে গজিয়ে উঠেছিল সংবাদমাধ্যম। যার মালিক তথা সম্পাদকরা সাংবাদিকতার অ-আ-ক-খ পর্যন্ত বুঝতেন না। সেই অযোগ্য মানুষদের হাতে সাংবাদিকতার একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করল। আর চিটফান্ড যখন মুখ থুবরে পড়ল তখনই হারিয়ে গেল সেই মাধ্যমগুলিও। হারিয়ে গেলেন অনেক প্রতিভাবান সাংবাদিক। অথবা টিকে থাকার তাগিদে খুব কম টাকায় অন্য কোথাও কাজ করতে শুরু করলেন। আর এই সুযোগে কিছু প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের ম্যানেজমেন্ট কম টাকায় ভালো কিছু সাংবাদিককে পেয়ে গেলেন। এ ঘটনা যে আগে কখনও ঘটেনি এমনটা নয়, তবে চিটফান্ডের কাগজগুলি বন্ধ হবার পর তা বেড়ে গেল। যা এখনও চলেছে। পুজোর মুখে বোনাস না হলে কারখানার কর্মচারিরা যখন আন্দোলন করেন, সেই খবর বড় বড় করে ছাপা হলেও সেই কাগজের সাংবাদিক বা কর্মচারিরা হয়ত পুজোর মাসে বেতন পান না। তাও তাদের কিছুই বলার থাকে না। কারণ বললেই ছাটাই-এর হুমকি থাকে। তবে সব সংবাদমাধ্যেমের ক্ষেত্রে যে একই হয় তা কিন্তু নয়। বিশেষত ছোট কাগজের ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রতিকুলতা দেখা যায়। কাগজের প্রধান আয় বিজ্ঞাপন ও কাগজ বিক্রি। সব কিছু ঠিক থাকলেও এঘটনা বার বার ঘটে এমন নজিরও প্রচুর রয়েছে। লভ্যাংশ বাড়াতে ও মালিকের তাবেদারি করতে ম্যানেজমেন্ট এমনটা করে একথা বলাই যায়। অবশ্য এর বাইরেও কিছু বিষয় আছে। যেমন ধরুন ছোট কাগজকে শেষ করতে বড় কাগজের কিছু বেআইনি প্রয়াস দেখা যায়। কাগজের সার্কুলেশনের ক্ষেত্রে নানাভাবে বাঁধা দেওয়া হয়। কোনও এক এলাকার সব কাগজ কিনে নেওয়া হয় যাতে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে না পারে। এতে বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যায়। আবার কোনও একদিন সেই কাগজ একটাও না কিনে লস করে দেওয়া হয়। এভাবে বারবার আক্রমণ করে ছোট কাগজকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এইসব প্রতিকুলতার থেকেও বড় যে প্রতিকুলতা বর্তমানে প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে তা হল রাজনৈতিক চাপ। শাসক সর্বদাই চেষ্টা করে চলেছে তার সমালোচনাকারী সংবাদমাধ্যমকে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে এবং অন্যান্য সমস্তভাবে প্রতিকুলতার মধ্যে ফেলতে। যাতে তা বন্ধ হয়ে যায়। আর প্রশাসনের সেই মানসিকতার সুযোগ নিয়ে শাসক দলের সমর্থকরাও কখনও কখনও সেই সংবাদমাধ্যমের অফিসে চরাও হচ্ছেন বা সাংবাদিকদের উপর হামলা করছেন। ভোটের আগে সরকারি দলের বিরুদ্ধে সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করায় এক সংবাদমাধ্যমকে সরকারের তোপের মুখে পরতেও হয়েছে। যার কর্মচারিরা দিনের পর দিন বিনা বেতনে কাজ করে প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এসব প্রতিকুলতা নিয়ে যারা প্রতিদিন সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক খবরটা পরিবেশন করার চেষ্টা করেন তাদের মাথা থেকে হাত তুলে নেন সকলেই। দিনভর প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যে সংবাদ সংগ্রহ হয় তা অনেক সময় ছাপান হয় না। এর বিরুদ্ধেও সাংবাদিকদের কার্যত কিছুই করার থাকে না। এছাড়াও অন্যান্য সমস্যাতো রয়েছেই। এসব সত্বেও ছাত্রছাত্রীরা কেন এই পেশার প্রতি এত আকৃষ্ট হন সেটা একটা বড় প্রশ্ন আবার যারা আছেন তারা কেন ছেড়ে যান না সেটাও প্রশ্ন উঠতেই পারে। এক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয় সাংবাদিকতা একটা নেশা। প্রতিদিন নতুন কিছু সংবাদ খুঁজে বের করার নেশা। সেই নেশার টান যেমন আছে আবার গ্ল্যামারের হাতছানিও রয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন নতুন মানুষের সাথে পরিচয়, নেতা, মন্ত্রী বা অভিনেতাদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকার সুযোগটাও ছাত্রছাত্রীদের কাছে একটা আকর্ষণ বটে। আর যারা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন তাদের কাছেও এটা একটা আকর্ষণীয় পেশা। খবর মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে, খবর মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিতে পারে, খবর রাজনৈতিক নেতাকে আসামী বানাতে পারে, খবর একটা সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। খবর জনসমর্থন গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্রের এমন একটা স্তম্ভ আজ বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানগুলিকে সবকিছু মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হচ্ছে তেমনই সাংবাদিকদেরও টিকে থাকতে হচ্ছে এক চরম প্রতিকুলতার মধ্যে দিয়ে। অপ্রিয় হলেও এটা সত্যি যে এটার জন্য অবশ্যই কিছুটা দায়ী বাংলার সাংবাদিকরা নিজেরাই। অন্য রাজ্যে বা বিদেশে যে পেশাদারিত্ব দেখা যায় কলকাতার ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। খুব অল্প টাকাতে চাকরি করা সাংবাদিক বেতন বাড়াবার জন্য বেশি সময় কাজ করছেন, ম্যানেজমেন্টের চোখে ভালো হওয়ার চেষ্টা করছেন। যা বাংলার বাইরে সাধারণত দেখা যায় না। সেখানে পেশাদারিত্বটাই সবচেয়ে বড় পাওনা, বেশি সময় কাজ করলেও বেশি টাকা পাওয়া যায় না। ফলে সবাই সমান। ভবিষ্যতের সাংবাদিক অর্থাত্ আজ যারা ছাত্রছাত্রী তারা কি পারবে এই প্রথা ভাঙতে নাকি ম্যানেজমেন্ট দিনের পর দিন এই সুবিধা পেয়ে যাবে। এই প্রশ্নের সঙ্গেই আরও একটি প্রশ্ন হচ্ছে এভাবে বাংলা সাংবাদিকতা বেঁচে থাকবে তো?

Spread the love

আপনার প্রিয় ওয়েব ম্যাগাজিন ‘Life24’-এ আপনিও লিখতে পারেন এই ম্যাগাজিনের উপযুক্ত যে কোনও লেখা। লেখার সঙ্গে পাঠাবেন উপযুক্ত ২-৩টি ফটো। লেখা পাঠাবেন ইউনিকোডে টাইপ করে। ইউনিকোড ছাড়া কোনও লেখাই গ্রহণ করা হবে না। লেখা ও ফটো পাঠাবেন editor.life24@gmail.com আইডি-তে। কোন সেগমেন্টের লেখা পাঠাচ্ছেন, তা মেলের সাবজেক্টে অবশ্যই লিখে দেবেন। আর অবশ্যই মেলে আপনার নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর জানাবেন।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে খুব কম খরচে আপনার পণ্য কিংবা সংস্থার বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন। বিস্তারিত জানার জন্য মেল করুন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে ৩১ মার্চ পর্যন্ত আপনি একেবারেই বিনামূল্যে দিতে পারবেন শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন। এই বিভাগের যে কোনও সেগমেন্টের জন্য ৫০ শব্দের মধ্যে ইউনিকোডে লিখে মেল করে দিন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।  মেলের সাবজেক্টে লিখে দেবেন 'শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন'।

# 'Life24' ওয়েব ম্যাগাজিন বা এই ওয়েব ম্যাগাজিনের লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত লিখে জানান নিচের কমেন্ট বক্স-এ। আর হ্যাঁ, ম্যাগাজিনটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার পরিচিতদের।