ডাউকির ডাকে হাতছানি

Life24 Desk   -  

দেবব্রত চাকলাদার

দুধারে গভীর খাদ। মাঝখানের রাস্তা দিয়ে হেঁচে চলা। অ্যাডভেঞ্চালপ্রিয় মানুষ, কেউ কি মিস করতে চাইবেন? একেবারেই না। ভূ-ভারতে নাকি এ রকম রাস্তা মিলবে না, একমাত্র মেঘালয়ের ডাউকি ছাড়া। তাহলে তো ডাউকি যেতেই হয়…

আমরাও কয়েকজন মিলে বেরিয়ে পড়লাম ডাউকির ডাকে।

কলকাতা থেকে গুয়াহাটি নেমে একদিন আশপাশটা ঘুরে নিলাম। চেরাপুঞ্জি আর বরাপানিতে তিনদিন কাটিয়ে সোজা মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে।

প্রথম দিন শিলং পিক আর এলিফ্যান্ট ফলস দেখতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। পরদিন অল্প সময়ের মধ্যে শিলং গল্ফ কোর্স দেখে নিয়ে গাড়িতে চললাম ডাউকির দিকে। ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্তে ডাউকি। ওপারে বাংলাদেশের শ্রীহট্ট। রয়েছে সুরমা নদীর ব-দ্বীপ।

গাড়ি শিলং ছাড়িয়ে পাহাড়ি রাস্তায় পড়তেই মনে হল বিভিন্ন বইয়ে অনেক সময়েই পড়েছি যাত্রার আসল আনন্দ লুকিয়ে রয়েছে পথ চলাতেই। শিলং ছাড়িয়ে পাহাড়ি পথ ধরার সময় কেন জানি না এক অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছিল।

যাত্রাপথের বেশ কিছুটা শিলং-চেরাপুঞ্জির রাস্তা। একদিকে গহন গভীর খাদ, অন্য দিকে খাড়াই পাহাড়ি দেওয়াল। মাঝখানে এক টুকরো জঙ্গল।

গাড়ি যখন বাঁক নিচ্ছে তখন নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি কয়েক হাজার ফুট নীচে পাহাড়ি ঝরনা দেখা যাচ্ছে। এত ছোট দেখাচ্ছে যে মনে হচ্ছে কেউ যেন পিচকিরি দিয়ে জল ঢালছে।

শুধু খাদ নয়। গ্রামেরও দেখা মিলছে। পথের ধারে কাঠের বাড়ি। অনেকগুলোই দোতলা। দেখলেই বোঝা যায় বাড়ির মালিকরা বেশ রুচিশীল। দরজা, জানলায় মানানসই পর্দা। একের পর এক রঙবেরঙের বাড়ি।

পথে যতগুলি গ্রাম নজরে এল সবগুলিতেই দেখলাম রয়েছে গির্জা। গ্রামের মিলনস্থল হিসাবেও গির্জা কাজ করে তার পরিচয়ও মিলল খানিক পরে। গির্জা থেকে হাসি মুখে গল্প করতে করতে বেরিয়ে আসছিলেন গ্রামের একদল মানুষ। তাঁদের সামনে ছুটোছুটি করছিল ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। এক কথায় পুরোটাই উত্সবের মেজাজ।

গ্রামে আর একটা জিনিস নজরে পড়ল। খবরের কাগজ। খাসি ভাষার হরফ রোমান। তাই দোকানে ঝোলানো কাগজগুলো দূর থেকে ইংরেজি বলে ভুল হচ্ছিল। সেই সব দোকানে চা-জলখাবার যেমন বিক্রি হচ্ছে, তেমনি মুদির দোকান হিসাবেও কাজ করে তারা। ফলে ঠিক কলকাতার মতোই দোকানের সামনে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজে চোখ বোলাতে দেখা গেল অনেককেই।

রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছেন নানা বয়সের গ্রামবাসী। কেউ-বা পাশের পাহাড়ি জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে মাথায় করে নিয়ে ফিরছেন। কেউ-বা ছিপ নিয়ে চলেছেন কোনও জলাশয় থেকে মাছ ধরার আশায়।

একসময় চেরাপুঞ্জিকে বাঁদিকে রেখে আমরা চললাম ডাউকির দিকে। কিন্তু ডাউকি কোথায়? মাইলস্টোনে তো দেখা যাচ্ছে তামাবিলের নাম। পরে জেনেছিলাম তামাবিলই হল সীমান্ত। আর তার পাশের গ্রামের নাম ডাউকি। অনেক কাল আগে বোধহয় সীমান্তের কোনও চৌকি ছিল এখানে। তাই নামটা ডাউকি রয়ে গিয়েছে।

চেরাপুঞ্জির দিক থেকে মুখ ফেরানোর পরই যাত্রাপথের চেহারা পাল্টাতে শুরু করল। বুঝলাম এবার আমরা উপরে উঠতে শুরু করলাম। গাড়ি বেশ জোরেই চলছিল। যত উপরের দিকে উঠছিলাম তত আবহাওয়া ঠান্ডা হচ্ছিল।

আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম এক নির্জন পাহাড়ি রাস্তায়। বাঁক খেতে খেতে রাস্তাটা হারিয়ে গিয়েছে সামনের পাহাড়ের মধ্যে। দুপুরের রোদ মেখে কয়েক হাজার ফুট নেমে যাওয়া ভয়ংকর সুন্দর পাহাড়ি জঙ্গল চেয়ে রয়েছে আমাদের দিকে।

রাস্তার রূপ দ্রুত বদলাচ্ছিল। গাড়ি পাকদণ্ডি বেয়ে ক্রমেই পামসুতিয়া গিরিখাতের উপরে উঠছিল। নীচে ভয়াল সবুজ জঙ্গলে ঢাকা পাহাড় শ্রেণি। দূরের পাহাড়ি রাস্তায় খেলনার মতো ছোট্ট গাড়িও দেখতে পাচ্ছিলাম।

শোঁ শোঁ হাওয়ার শব্দ। চরকি পাক খেতে খেতে গাড়ি পাহাড়ি রাস্তায় উঠছে। আর তাতেই মাথা ঘুরে যাচ্ছে আমাদের। বুঝতে পেরে ড্রাইভার গাড়ির স্পিড কমালো। আবার প্রকৃতিকে দু ভরে দেখার সুযোগ হল।

যতদূরে চোখ যায় একের পর এক পাহাড়। ঘন জঙ্গল নেমেছে সেই সব পাহাড়ের গা বেয়ে। সেই গাঢ় সবুজ রয়েছে নীল আকাশের তলায়। গিরিখাত কতদূরে নেমেছে তা দেখা গেল না। কানে এল জলপ্রপাতের শব্দ। চোখে না দেখা গেলেও বুঝলাম ধারেকাছেই রয়েছে ঝরনা।

মিনিট কুড়ি ধরে চলল সেই সর্বোচ্চ উচ্চতার পথ দিয়ে চলা। তারপর হঠাত্ পথের বাঁক নিতেই দেখি জাদুমন্ত্রে সামনে হাজির এক বিশাল উপত্যকা। আর সেখানে রয়েছে ছোট্ট গ্রাম।

 

এত উপরে মানুষের বসবাস দেখে একটা কথা মনে হল– মানুষ যুগে যুগে প্রকৃতিকে এমন ভাবেই বশ মানিয়েছে। কিন্তু গ্রামবাসীরা নীচের সমতলে যাতায়াত করেন কী ভাবে? একটু পরেই সেই প্রশ্নের উত্তর নিজেরাই পেয়ে গেলাম।

আমাদের উলটোদিক থেকে আসছিল একটা ট্যাক্সি। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছিলেন কয়েকজন গ্রামবাসী। তাদের দেখে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে গেল। গ্রামবাসীরাও ঝটপট তাতে উঠে পড়লেন। গাড়িটা সমতলে নামার রাস্তা ধরল। এই অবস্থা দেখেছিলাম গুয়াহাটি থেকে চেরাপুঞ্জি পর‌্যন্ত এলাকাতেও।

শিলং থেকে যখন বেড়িয়েছিলাম তখন জানতাম যাত্রাপথ বড় জোর আড়াই ঘণ্টার। কিন্তু একটু একটু করে আড়াই ঘণ্টা কখন পেরিয়ে গেল। তবু পথের পাশে মাইলস্টোনে তামাবিল আর শেষই হচ্ছে না।

মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল ঠিক পথে যাচ্ছি তো? কোনও পাহাড়ি বাঁকে ভুল রাস্তায় চলে যাচ্ছি না তো? পরক্ষণেই ভাবলাম ড্রাইভার তো এলাকারই লোক।

এবার গাড়ি নামতে শুরু করেছে। যে পাহাড়গুলোকে এতক্ষণ অনায়াসে দেখতে পাচ্ছিলাম, সেগুলিকেই এখন মাথা উঁচু করে দেখতে হচ্ছে।

জঙ্গলের পথও শুরু হচ্ছে। ছোট রাস্তা। দু দিয়ে গাছ যেন পথকে গ্রাস করতে এগোচ্ছে।

মনে হল হেঁটে জঙ্গলের রূপ উপভোগ করা দরকার। গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। আধঘণ্টার পথ এগিয়ে গিয়েছি। জঙ্গল যে এত অন্ধকার হতে পারে, সেটা প্রত্যক্ষ করলাম। ড্রাইভার সঙ্গেই এসেছিল। সে বলল, আর বেশিদূর পায়ে হেঁটে এগোনো ঠিক হবে না। সামনেই গভীর গিরিখাত। লোভ সম্বরণ করে তাঁর কথায় ফিরে এলাম।

নীচে নামতে থাকার সঙ্গে সঙ্গেই ঠান্ডা ভাবটাও চলে গেল। সবাই সোয়েটার-জ্যাকেট খুলতে শুরু করলাম। খুলে গেল ডানদিকের জঙ্গলের অবগুণ্ঠনটাও। সামনে ভেসে উঠল সুরমা নদীর বিশাল ব-দ্বীপ। বিশাল অঞ্চল। যতদূর চোখ যায় শুধু নদীর তটভূমি। মাঝে মধ্যে নদী বয়ে চলেছে। রোদ্দুর পড়ে সেই জল চিকচিক করছে।

কানে এক ট্রেনের শব্দ। নিশ্চয়ই ধারে-কাছে কোনও রেললাইন রয়েছে। অদৃশ্য থেকেই সে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। খাসি পাহাড় এখানেই শেষ। সঙ্গে ভারতীয় ভূখণ্ডও। তারপরই বাংলাদেশের সমতলভূমি।

আমরা সেই সমতলভূমির দিকে এগোতে থাকলাম। তবে বেশি দূর গেলাম না। কারণ সামনেই তো অসাধারণ দৃশ্য।

পাহাড়ি রাস্তার ডানদিকে সুরমা ব-দ্বীপ অঞ্চল তার রূপের ডালি সাজিয়ে উপস্থিত। আর তাকে অলঙ্কারিত করেছে উমগোট খাড়ি।

খাঁড়ির মুখে কয়েকশো নৌকো। এমন ভাবে পাশাপাশি নৌকাগুলি রাখা যে একজন অনায়াসে খাঁড়ির মুখ পার হয়ে যেতে পারে সেটাকে সেতু হিসাবে ব্যবহার করে। আর খাঁড়ির সবুজ জলে নৌকো ভাসছে অনেক। তাতে চেপে অনেক জেলে বসে রয়েছেন। মাথায় নানা রংয়ের টুপি। পরনে রংবেরংয়ের পোশাক।

বেশ খানিকক্ষণ ওখানেই কেটে গেল। কিন্তু ডাউকি যেতে হবে তো? সারথি বললেন, আসলে আমরা যাচ্ছি তামাবিল। সীমান্ত পয়েন্ট। সেতু পেরিয়ে গাড়ি চলল সেই দিকে। কিছুদূর গিয়ে বোঝা গেল সীমান্ত সামনেই।

একটু পরেই গাড়ি থেমে গেল। নেমে দেখি সীমান্তের ফলক। একটা ছোট্ট বাড়িতে একদল অফিসার বসে কাগজপত্র পরীক্ষা করছেন। দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে লরির সারি। এক অফিসার জানালেন, অদূরেই নো ম্যানস ল্যান্ড পেরিয়েই বাংলাদেশ।

চেক পোস্ট ছেড়ে চলে আসছি। হঠাত্ নজরে পড়ল দূরে মাঠের ঝোপঝাড়ের মধ্যে অবহেলায় পড়ে থাকা এক শহিদ বেদি। ভালো করে দেখলাম সেটা বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিরক্ষার্থে তৈরি।

বিকেল দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। বাঁ-পাশে গিরিখাতকে রেখে গাড়ি তখন শিলং ফিরছে। দূরে দেখা যাচ্ছে একের পর এক কুয়াশার আবরণে ঢাকা খাসি পাহাড়। আর সেই পাহাড়ের গায়েই সূর‌্য অস্ত যাচ্ছে। এমন দিগন্ত জুড়ানো দৃশ্যকে কি ফেলে যাওয়া যায়?

দাঁড়িয়ে গেলাম। চেষ্টা শুরু হল ক্যামেরায় মুহুর্তটাকে বন্দি করে নেওয়ার। নির্জন খাসি পাহাড়শ্রেণিকে সাক্ষী রেখে সূর‌্য অস্ত গেল। ধীরে ধীরে অন্ধকার পুরো দিগন্তকে গ্রাস করতে শুরু করল।

এবার গাড়ির হেডলাইটই একমাত্র দৃশ্যমান আলো। অবশ্য সেদিনটা ছিল পূর্ণিমা। ফলে চাঁদও তার স্বমহিমায়। নির্জন পাহাড়, জঙ্গল, নদী। আর তাতে পড়েছে চাঁদের আলো। ছুটন্ত গাড়ি থেকেও স্পষ্ট বুঝলাম ফের চেনাশোনা জগত্ থেকে অন্য এক বিশ্বের রূপ দেখছি। জ্যোত্স্নায় ভেসে যাচ্ছে নির্জন উপত্যকা। ভেসে যাচ্ছে পাহাড়, জঙ্গল, নদীখাত। অজানা ঝরনার জল চিকচিক করছে। অজানা পাখির দল ডাকছে। এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যে ভরে রয়েছে প্রকৃতি।

পাহাড়ের অনেক উপরে গাড়ি রয়েছে। নীচের রাস্তায় গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখা যাচ্ছে বহুদূর থেকে।

রাস্তার দু গিরিখাতের সঙ্গে দেখা হয়নি। বেশির ভাগ রাস্তাটাই সীমান্তরক্ষীদের জন্যই হয়তো বেশ ভালো। কিন্তু তা সত্ত্বেও ডাউকিকে ভোলা যাবে না।

হাজার হাজার ফুট গভীর গিরিখাতকে পাশে রেখে অদ্ভুত শোঁ শোঁ শব্দের হাওয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া বা নির্জন পাহাড়শ্রেণিকে সাক্ষী রেখে সূর‌্যাস্ত বা জ্যোত্স্নায় ভেসে যাওয়া উপত্যকা বা সবুজ জলের খাড়িতে নিশিন্তে মাছ ধরা– এসব দৃশ্য ইট-কাঠের জঙ্গলে মিলবে কোথায়?

Spread the love

আপনার প্রিয় ওয়েব ম্যাগাজিন ‘Life24’-এ আপনিও লিখতে পারেন এই ম্যাগাজিনের উপযুক্ত যে কোনও লেখা। লেখার সঙ্গে পাঠাবেন উপযুক্ত ২-৩টি ফটো। লেখা পাঠাবেন ইউনিকোডে টাইপ করে। ইউনিকোড ছাড়া কোনও লেখাই গ্রহণ করা হবে না। লেখা ও ফটো পাঠাবেন editor.life24@gmail.com আইডি-তে। কোন সেগমেন্টের লেখা পাঠাচ্ছেন, তা মেলের সাবজেক্টে অবশ্যই লিখে দেবেন। আর অবশ্যই মেলে আপনার নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর জানাবেন।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে খুব কম খরচে আপনার পণ্য কিংবা সংস্থার বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন। বিস্তারিত জানার জন্য মেল করুন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে ৩১ মার্চ পর্যন্ত আপনি একেবারেই বিনামূল্যে দিতে পারবেন শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন। এই বিভাগের যে কোনও সেগমেন্টের জন্য ৫০ শব্দের মধ্যে ইউনিকোডে লিখে মেল করে দিন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।  মেলের সাবজেক্টে লিখে দেবেন 'শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন'।

# 'Life24' ওয়েব ম্যাগাজিন বা এই ওয়েব ম্যাগাজিনের লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত লিখে জানান নিচের কমেন্ট বক্স-এ। আর হ্যাঁ, ম্যাগাজিনটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার পরিচিতদের।