বসন্ত উতসবের সঙ্গে প্রেমের কি কোনও সম্পর্ক রয়েছে?

Life24 Desk   -  

রাত পোহালেই দোল। একে অপরকে নানান রঙে রাঙিয়ে দিয়ে মেতে উঠবেন এই উতসবে। ইদানীং আমরা ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে মেতে উঠলেও দোলই কিন্তু বাঙালি তথা হিন্দুদের কাছে একটা প্রেমের দিন।

দোল মানেই তো বসন্ত উতসব, আর বসন্ত মানেই তো প্রেম। এই সময় প্রকৃতির মধ্যেই চারিদিকে প্রেমের গন্ধ ছড়িয়ে থাকে। আকাশে-বাতাসে সব জায়গায় প্রেমের অনুভূতি। চারিদিকে পাখির কলরবে যেন প্রেমেরই গুঞ্জন।

দোল মানুষের এই আবেগকে আরও একটু বাড়িয়ে দেয়। এদিন সকলেই একে অপরকে নানান রঙে রাঙিয়ে দিয়ে নিজেরাও হয়ে ওঠেন রঙিন। ভালোবাসার মানুষ তো এইদিনই নিজেদের প্রিয়জনকে একটু আবিরের রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন। প্রিয়জনকে দেওয়া আবিরের সঙ্গে মিশে থাকে তাঁর একরাশ ভালোবাসা। এমনও হয় হয়তো কেউ কাউকে অনেকদিন ধরে ভালোবাসেন, কিন্তু বলে ওঠার সুযোগ হয়নি। এই উতসবই সেই সুযোগ এনে দেয়, একফোঁটা আবির দিয়ে ভালোবাসার মানুষের মুখ রাঙিয়ে তাঁর ভালোবাসার কথা প্রকাশ করার। স্বয়ং প্রেমের ঠাকুর শ্রীকৃষ্ণও তো তাঁর প্রেমিকা রাধিকাকে রঙে রঙে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন। সখীদের সঙ্গে মেতে উঠেছিলেন রং খেলায়।

মনস্তত্ত্ববিদ দোলা মজুমদারের কথায়, দোল উতসবের সঙ্গে প্রেমের তো একটা সম্পর্ক আছেই। এই সময় ওয়েদারটা ভালো থাকে। আর দুটো মানুষ তখনই প্রেমে পড়েন, যখন তাঁদের মন ভালো থাকে। বসন্তকালে চারিদিকে একটা প্রেমের পরশ থাকে। এই সময় গরমটাও তেমন থাকে না। যদিও এখন গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর জন্য অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। তবুও বসন্ত উতসব আর প্রেম এই বিষয়টা এখনও একই রকম রয়েছে। এই সময় প্রেমের গভীরতা আর আবেগ অনেকটাই বেড়ে যায় মানুষের মধ্যে।

দোল উতসব এমনই একটা উতসব যেদিন সকলে সমস্ত বিভেদ ভুলে একসঙ্গে রং খেলায় মেতে ওঠেন। সকাল হতেই রং নিয়ে বেড়িয়ে পরেন। চুটিয়ে মজা করেন। বাচ্চাদের মজাও কিছু কম নয়, পিচকিরি, বেলুন দিয়ে কার গায়ে রং ছুঁড়বে, তাতেই তাদের আনন্দ। এইদিন ছোটদেরও সবকিছু ভুলে মজা করার দিন। বড়রা তাদের চোখ রাঙিয়ে বলতে পারেন না, বই নিয়ে পড়তে বোস। কারণ তাঁরা নিজেরাই তো মেতে থাকেন অনাবিল আনন্দে। দোল মানেই ছোট-বড় সকলে মিলে একসঙ্গে হই-হুল্লোড় করার দিন। একসঙ্গে মেতে ওঠার দিন। শুধু তো আনন্দ নয়, থাকে নানা রকম খাবারের আয়োজন। খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ সব মিলিয়ে একটা এলাহি ব্যাপার বলা যায়।

এইদিন রং দিয়ে একে অন্যকে রাঙিয়ে দিয়ে নিজেদের মধ্যে যদি কোনও বিভেদ থাকে সেটাও মিটিয়ে নেন। চারিদিক শিমুল, পলাশের রঙে রঙিন হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবে মানুষের মনকেও সেই রঙের পরশ রাঙিয়ে দিয়ে যায়।

রং খেলার তো কোনও বয়স হয় না। মনকে রাঙিয়ে তুলতে তো সকলেই চান। এর জন্য দোলের থেকে ভালো দিন আর কী হতে পারে। রং খেলার ক্রেজ বোধহয় ছোট-বড় সকলের মধ্যেই থাকে। প্রত্যেকেই চায় তার ভালো লাগার, ভালোবাসার মানুষকে একটু রাঙিয়ে দিতে বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন প্রত্যেকেই থাকেন এই তালিকায়। স্কুল বা কলেজপড়ুয়াদের মধ্যে তো দেখা যায় দোলের দিন যেহেতু স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকে তাই আগের দিনই ব্যাগে করে রং নিয়ে যাওয়া, ছুটির সময় একে অন্যকে আবির মাখিয়ে একদফা দোল উতসব পালনও করে নেয়। এটাই তো একটা আলাদা আনন্দ।

দোলের দিন আপনজনকে রাঙিয়ে তুলতে আমরা নানা ধরনের রং ব্যবহার করলেও দোল খেলার জন্য আবিরের থেকে  ভালো আর কিছু নেই। এতদিনে নিশ্চয়ই প্ল্যান করে নিয়েছেন কাকে কাকে রং লাগাবেন। তাহলে বলব যাঁদের যাঁদের রং লাগাবেন বলে ভেবেছেন তাঁদের আবির দিয়ে রঙিন করাটাই ভালো। বাজারে এখন অনেক ভেষজ রং পাওয়া যায়। যদি সেটা নিতে পারেন তাহলে তো আর কোনও কথাই নেই। কারণ অনেকে ত্বকের সমস্যার জন্য রং থেকে দূরে থাকেন, কিন্তু ভেষজ রং নিলে কিন্তু সে আপনার রং মাখানোর আবদারকে না বলবে না।

কলকাতার প্রখ্যাত স্কিন স্পেশালিস্ট ডা. সুব্রত মালাকার বললেন, এখন ফুল থেকে যে সমস্ত রং তৈরি হচ্ছে, সেগুলো স্কিনের জন্য ভালো। এছাড়া আবির মাখলেও ত্বকের কোনও রকম সমস্যা হওযার সম্ভাবনা থাকে না। রং খেলার পর ভালো করে তা পরিষ্কার করে নিলে স্কিনের কোনও রকম ইনফেকশনের সম্ভাবনাই নেই।

দোল মানেই তো শান্তিনিকেতনের কথা চলে আসে। কবিগুরু এখানে অভিনব এক দোল উতসবের সূচনা করেছিলেন। যার ঐতিহ্য এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। এখানে আরও একটা কথা না বললেই নয়। বসন্ত উতসবের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। কবিগুরুর সেই ‘খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল’, কিংবা ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও, যাও গো এবার যাওয়ার আগে’ সবই তো বসন্ত উতসবকে ঘিরে। যেখানে প্রেম রয়েছে সেখানে গান থাকবেন না এমনটা কি হয়। গান ছাড়া কি প্রেম হয়, নাকি প্রেম সম্পূর্ণ হয় গানকে ছাড়া।

কথার রেশ টেনে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী লাজবন্তী রায় বললেন, বসন্ত উতসব মানেই তো প্রেমের উতসব। আর এই উতসব কখনও রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া সম্পূর্ণ হয় নাকি? কারণ দোল বা বসন্ত উতসবের অনেক গান থাকলেও রবীন্দ্রসংগীত এই উতসবে একটা আলাদা মাত্রা এনে দেয়। তাছাড়া রবীন্দ্রসংগীতই পারে প্রেমের অনুভূতিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলতে।

 

 

অন্যদিকে মনস্তত্ত্ববিদ এবং সংগীতশিল্পী রাজ্যশ্রী বন্দ্যোপ্যধ্যায়ের মত, বসন্ত ঋতুতে দোল উতসব হয়। এটা রঙের উতসব। রং যেমন বহু রকমের, মানব মনের আবেগ বা ইমোশনও তেমন বহু রকমের হয়। আবেগ ছাড়া কোনও কিছুই সম্ভব নয়। যে কোনও সৃষ্টির পিছনেই আছে আবেগ। এই আবেগকেই সংগীতশাস্ত্রে রস বলা হয়েছে। নটি রসের কথা শাস্ত্রে বর্ণিত আছে। রসগুলি সব যেন এক একটি রং। দোল উতসব হচ্ছে নারী-পুরুষের একের অন্যের প্রতি যে স্বাভাবিক আকর্ষণ, স্বাভাবিক প্রেম-ভালোবাসা সেটারই প্রতীক। নারী-পুরুষ একে অন্যের পরিপূরক। একে অন্যকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। রাধা-কৃষ্ণের দোল উত্সব সেই ভালোবাসাকেই প্রকাশ করতে সাহায্য করে। রং ছাড়া প্রেমহীন জীবন হয়ে ওঠে বিষাদ। তাই দোল আর প্রেমের যে গভীর সম্পর্ক, তা অনস্বীকার্য।

 

Spread the love

আপনার প্রিয় ওয়েব ম্যাগাজিন ‘Life24’-এ আপনিও লিখতে পারেন এই ম্যাগাজিনের উপযুক্ত যে কোনও লেখা। লেখার সঙ্গে পাঠাবেন উপযুক্ত ২-৩টি ফটো। লেখা পাঠাবেন ইউনিকোডে টাইপ করে। ইউনিকোড ছাড়া কোনও লেখাই গ্রহণ করা হবে না। লেখা ও ফটো পাঠাবেন editor.life24@gmail.com আইডি-তে। কোন সেগমেন্টের লেখা পাঠাচ্ছেন, তা মেলের সাবজেক্টে অবশ্যই লিখে দেবেন। আর অবশ্যই মেলে আপনার নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর জানাবেন।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে খুব কম খরচে আপনার পণ্য কিংবা সংস্থার বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন। বিস্তারিত জানার জন্য মেল করুন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে ৩১ মার্চ পর্যন্ত আপনি একেবারেই বিনামূল্যে দিতে পারবেন শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন। এই বিভাগের যে কোনও সেগমেন্টের জন্য ৫০ শব্দের মধ্যে ইউনিকোডে লিখে মেল করে দিন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।  মেলের সাবজেক্টে লিখে দেবেন 'শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন'।

# 'Life24' ওয়েব ম্যাগাজিন বা এই ওয়েব ম্যাগাজিনের লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত লিখে জানান নিচের কমেন্ট বক্স-এ। আর হ্যাঁ, ম্যাগাজিনটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার পরিচিতদের।