কতটা নিরাপদ রাতের কলকাতা?

Life24 Desk   -  

বড় বিচিত্র শহর এই কলকাতা। তার অলিতে গলিতে যেমন রয়েছে বহু বছরের পুরনো ইতিহাস তেমনি রহস্যময়তার ছাপ। দিনেরবেলা ব্যস্ত শহর, ট্রাফিক- জ্যাম- গাড়ির শব্দ- মানুষের কোলাহল। ব্যস্ত রাস্তা জুড়ে গাড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষের ব্যাস্ততা। দিনেরবেলার এই ছুটে চলা শহরটা একেবারে অন্যরকম থাকে রাতে শান্ত, স্নিগ্ধ। তবুও এই শান্ত কলকাতাতেই ঘটেছে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা। গৃহবধু থেকে আই.টি. কর্মী, সল্টলেক থেকে ডানলপ, সবার ভেতরেই রাতে বাড়ির বাইরে থাকা মানেই অজানা ফোবিয়া। ট্যাক্সি-ড্রাইভার থেকে পাহারাদার, সহযাত্রী বা সহকর্মী, নিরাপত্তার বেড়াজাল কতটা শক্ত? কতটা নিরাপদ মহিলারা এই শহরে? একের পর এক ঘটে চলা ঘটনাতে কতটা নড়ে বসেছে প্রশাসন? কতটা নিরাপদ রাতের কলকাতা? সেই নিয়েই আজকের যুক্তি-তর্ক-আড্ডা।

সমীর আইচ (চিত্রশিল্পী): এখন আমি রাতে রেরোই না, যখন বেরোতাম তখন দেখেছি রাতের কলকাতায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হচ্ছে পুলিশ। মানুষ যাদের ওপর ভরসা করে তারাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। তার কারনটা হল সিকিউরিটি দেওয়া তো দূরে থাক, অযথা মানুষকে ধরে হ্যারাসমেন্ট করে পুলিশ। দ্বিতীয় কথা এই যে আমরা শুনছি নাইট ক্লাব বন্ধ করে দেওয়া উচিত। নাইটক্লাব কেন রাত্রিবেলা চলে? আমার প্রশ্ন হল তাহলে নাইট ক্লাব কি সকাল ছ’টা থেকে শুরু হবে? সারা পৃথিবীতে নাইটক্লাব কই এত অসভ্যতা তো হয়না! সেখানে সিকিউরিটির ব্যবস্থা আছে। আসলে পুলিশ-প্রশাসনের ব্যার্থতা ঢাকার জন্য বিভিন্ন কথা বলা হচ্ছে। যেমন কিছুদিন আগে মনিকা বলে মেয়েটির মর্মান্তিক মৃত্যু দেখালাম। সেখানেও পুলিশের যে ভুমিকা দেখলাম তাতে আমি শুধু না আমার মনে হয় সকলেই স্তম্ভিত। পুলিশ সাতদিন-দশদিন পর রক্তের নমুনা নিচ্ছে ঐ রকম একটা বীভৎস ঘটনার পরও! এগুলো আমাদের এখানেই সম্ভব। বজ্র আটুনি ফস্কা গেরো থাকলে সেটাই মুস্কিল। এই ব্যাবস্থা যদি ঠিক হয় আমার মনে রাতের কলকাতা সেফ হবে কারন আমাদের ভারতবর্ষেই কিন্তু মুম্বাই আছে, ব্যাঙ্গালোর আছে, চেন্নাই আছে। ওখানে কখনও এতটা আনসেফ মনে হয়না যতটা আমাদের কলকাতায়। এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক।

রমেন দাশগুপ্ত (একটি মেয়ের অভিভাবক) : আমার মেয়ে কজনিজেন্টে চাকরি করে, অনেক রাতে বাড়ি ফেরে এটা আমাদের কাছে একটা প্যানিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা একদমই নিশ্চিন্তায় থাকতে পারিনা প্রতিদিন যা সব ঘটনা ঘটছে, খুবই ভয়াবহ। আমাদের রাতের ঘুম চলে গেছে। আমার একটাই মেয়ে চার বছর হস্টেলে থেকেছে, তবু ওর মা চায় ও অফিসের কাছেই কোথাও থাকুক পেইং গেস্ট বা যেভাবেই হোক। অফিস গাড়িতে করে পাঠায় ঠিকই কিন্তু সেখানেও বা নিরাপত্তা কতটা? এখন যা অবস্থা ড্রাইভার বা কলিগ কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। প্রশাসন যদি নিরাপত্তা ব্যাবস্থার দিকে আর একটু জোর দিত বা এই সেফটি নিয়ে ভাবতো তাহলে হয়ত আমাদের মত অনেকেই একটু নিশ্চিন্ত হতে পারতাম।

দীপন যাদব(ওলা-ড্রাইভার): আমদের ওলা, উবের বা ট্যাক্সি ড্রাইভারদের রাতেও সারা কলকাতা ঘুরতে হয়। চোখের সামনে অনেক ঘটনাই ঘটে। কখনও নিজের সেফটির কথা ভেবে এড়িয়ে যেতে হয়। অনেক ট্যাক্সি ড্রাইভারদের বিরুদ্ধেও অনেক অভিযোগ আছে। তবে ওলা-উবের অনেকটাই সেফ, কারন এখানে আপনি সবটাই ট্র্যাক করতে পারবেন কোথায় যাচ্ছেন, কোন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন, ড্রাইভারের নাম, ফোন নম্বর। রাতে কলকাতার রাস্তায় অনেক জায়গাতেই দেখেছি পুলিশের যেখানে ভূমিকা থাকার কথা ছিল সেখানে পুলিশ নিস্ক্রিয়। অনেক ট্রাফিক চৌকিতে আলো জ্বললেও পুলিশ থাকে না। ডানলপ ক্রসিং বলুন বা ইএম বাইপাস অনেক কিয়স্কেই আলো নেভানো থাকে রাতে, আর আলো জ্বললেও পুলিশকে খুঁজে পাওয়া যায়না।  তবে অনেক জায়গাতে পুলিশি টহল ভালো। আর একটা ব্যাপার হল রাতে পুলিশের হ্যারাসমেন্ট সহ্য করাটা খুব সমস্যা আজকাল, কারনে-অকারনে গাড়ি দাড় করিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন।

জয়েন সি.পি. হেড কোয়ার্টারঃ রাতের কলকাতার নিরাপত্তা ব্যাবস্থা এখন আরো জোরদার হচ্ছে। একজন ডেপুটি কমিশনার আর দুজন অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনারের আন্ডারে পুলিশি টহল চলে প্রত্যেকদিন রাতে। ডেপুটি কমিশনার বাই রোটেশন এবং একজন অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার পুরনো কলকাতার এরিয়ায় এবং একজন কমিশনার অ্যাডেড এরিয়ায় অর্থাৎ নতুন যে অংশটা যোগ, হয়েছে তার মধ্যে তো সারভেনাস চলেই। তাছাড়া সমস্ত থানা, সমস্ত ট্রাফিক তো আছে। ট্রাফিকের তরফ থেকেও একজন অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার এবং একজন ইন্সপেক্টর প্রত্যেকদিন রাতে নাইট রাউন্ডে থাকেন। প্রত্যেকটা ডিভিশনের তরফ থেকে একজন অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার এবং একজন ইন্সপেকটর, থানার ও.সি. বা অ্যাডিশনাল ও.সি. তাদের ডিভিশনের ক্ষেত্রেও নাইট রাউন্ড করেন। প্রত্যেক ট্রাফিক গার্ডে দুজন করে সার্জেন এবং তাদের সাথে কনস্টেবল থাকে। তার সাথে ডিভিশনাল মোবাইল ও গাড়িগুলো থাকে সেগুলো রাতে টহল দেয় প্রতিনিয়ত।

Spread the love