লুলুং-এ নদীর সাথে যৌনতা

Life24 Desk   -  

শুভ ঘোষ

লুলুং- নামটার মধ্যেই কেমন একটা ছন্দ আছে, মনটা নেচে ওঠে। এবারের গন্তব্য লুলুং। ক্রিসমাস আর নিউইয়ার মিলিয়ে সাত দিনের ছুটিতে ‘কোথায় যাই’ ‘কোথায় যাই’ করতে করতে ঠিক হল; পাহাড়, সমুদ্র অনেক হয়েছে- এবার জঙ্গল। ওড়িশার সিমলিপাল জঙ্গলের মধ্যে ছোট এক গ্রাম লুলুং-এর নাম শুনতেই সকলের পছন্দ হয়ে গেল। অতঃপর লেলিন সরণীর উৎকল ভবনে দৌড়ঝাঁপ করে জোগাড় করা হল বনে ঢোকার প্রবেশপত্র ও পান্থনিবাসের বুকিং।

কলকাতা থেকে ঘন্টা চারেকের ট্রেন জার্নি করে বালাসোর স্টেশনে পৌঁছে কিছু ব্রেকফাষ্ট করেই ভাড়ার গাড়িতে ঘন্টা দেড়েকের দূরত্বে লুলুং। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার এই দিকটায় সিমলিপালের মত ঘন জঙ্গল নেই। তবু লাল মাটির সরানে কেমন যেন বুনো গন্ধ। পান্থনিবাসের উঠোনটায় গাড়ি পৌঁছতেই মনটা কেমন ভালো হয়ে গেল। যেন কোন চিত্রকরের আঁকা ল্যান্ডস্কেপ। চারপাশে সবুজ পাহাড় ঘেরা লাল ছাউনির আস্তানা। পাশ দিয়ে কুলকুল করে বয়ে চলেছে পলপলা নদী। আকাশ ছোঁয়া শালের বনে পাখিদের কিচির মিচির গান। “মার্ভেলাস”- মুখ থেকে বেড়িয়ে গেল সুমনের।

দুপুরে ওড়িয়া বামুনের হাতের লাঞ্চ খেয়ে ব্যালকনিতে বসে কানে হেড ফোন গুঁজে গান শুনছি, সুমন বই পড়ছে; এমন সময় কৌশিকদা, ‘সোনার কেল্লা’র মুকুলের মত চেঁচিয়ে উঠল- ঐ দেখো ময়ূর। দেখি গাছের ডালে একটা ময়ূর বসে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। গাছের নিচে আরও কয়েকটা ঘোরাঘুরি করছে। সুমনের ক্যামেরার শাটার সুযোগ পেয়ে শব্দ করেই চলল।

পূর্ণিমার চাঁদ কত মোহময় হতে পারে তার বর্ণনা বইতে অনেক পড়েছি। কিন্তু নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে চাঁদের আলোর রোশনাই কতটা সুন্দর- তার ধারনা পেলাম সেইদিন। পলপলা নদীর চিকচিকে জলের শব্দ আর শাল বনের চাঁদকে ছুঁতে চাওয়ার আকাঙ্খা এক অনবদ্য ছবি তৈরী করে দিল মনে। কেয়ারটেকারের কাছে শোনা গেল, এই পলপলা নদীতেই রাতে জল খেতে জড়ো হয় হরিণ ও হাতির দল। পান্থনিবাসের ব্যালকনিতেই বসে দেখা যায় সেই মনোরম দৃশ্য। সোলার বাল্বের আলোতেও যেন শিহরণ বয়ে গেল রোমকূপে।

পরের দিন ঘুম ভাঙল পাখির কূজন আর গরম বেড টি’র গন্ধে। ব্রেকফাষ্ট করেই বেড়িয়ে পড়লাম আসপাশটা ঘুরে দেখতে। জঙ্গলের পথে পৌঁছে গেলাম বরাপানি জলপ্রপাত। ৩৯৯ মিটার উঁচু থেকে ধবধবে সাদা জলের স্রোত এসে পড়ছে নিচে। প্রকৃতি যেন তার সব রং ঢেলে দিয়েছে এই ক্যানভাসে। ছোটনাগপুর মালভূমির এই অংশে মেঘাসানি, কৌরিবুড়ু’র মতো বেশ কিছু টিলা আছে- যার উপর থেকে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের ঘ্রাণ নেওয়া যায়। ফেরার পথে যাওয়া হল ৩ কিমি দুরের কালিপাহাড়ের সাঁওতাল গ্রামে। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌর জঙ্গলে’র নারীর পাথর খেঁদা রূপ ফুঁটে উঠল চোখের সামনে।

কটেজে ফিরেই জোর খিদে। কেয়ারটেকারকে খাবার দিতে বলেই স্নান করতে ছুটে গেলাম নদীতে- অ্যাডভেঞ্চারের তারণায়। পাথরে বসে পা জলে ডোবাতেই যেন কারেন্ট চলে গেল শিঁড়দাঁড়া দিয়ে। প্রাথমিক ঝটকা কাটিয়ে যখন জলে নামলাম, নদী যেন আদর করে জড়িয়ে ধরল শরীরকে। পাথরের ধাক্কায় উঠলে উঠছে নদীর বুক আর তার ছাঁট এসে লাগছে আমার চোখ, নাক, বুকে। পলপলার শীতল স্পর্শ রোমাঞ্চ জাগিয়ে চলল আমার প্রতিটি রক্তবিন্দুতে। অফুরন্ত সময় ধরে নদীর সাথে চলল যৌনতা। পলপলা- আমি যে তোমায় ভালোবেসেই ফেললাম।

পরের দিনের গন্তব্য যোশীপুরের রামতীর্থে কুমির প্রজনন কেন্দ্র। তিনদিনে চেটেপুটে ঘুরে ‘ঘুরু ঘুরু ট্রাভেলস্‌ প্রাইভেট লিমিটেড’র হেফাজতে চোখ ভরা সবুজ, ফুসফুস ভর্তি টাটকা বাতাস আর ক্যামেরা ভর্তি সৌন্দর্য্য।

কীভাবে যাবেনঃ কলকাতা থেকে লুলুং এর দূরত্ব ২৬০ কিমি। কলকাতা থেকে ট্রেনে চলে যান বালাশোর বা বারিপদা। সেখান থেকে বাস, ট্যাক্সি বা ভাড়ার গাড়িতে লুলুং।

এ ছাড়া গাড়িতে কলকাতা থেকে NH 6 ধরে বাংরিপোসি মোড় (কলকাতা থেকে ২৩০ কিমি) থেকে বেঁকে ২০ কিমি দুরেই লুলুং।

কোথায় থাকবেনঃ ওড়িশা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের অরণ্যনিবাস ছাড়া অন্য কোন বন্দোবস্ত নেই। ৮টি ডবল বেডরুম ও ২টি ডর্‌মেটরির (প্রতিটিতে ৮টি করে বেড) এই অরণ্যনিবাস বুক করতে যোগাযোগ করতে পারেন- ট্যুরিষ্ট অফিস, বারিপদাঃ (০৬৭৯২) ২৫২৭১০

OTDC, ভুবনেশ্বরঃ (০৬৭৪) ২৪৩০৭৬৪  বা কলকাতায় উৎকল ভবন, ৫৫ লেনিন সরণীঃ (০৩৩) ২২৪৯৩৬৫৩/ ২২৬৫৪৫৫৬

কী ঘুরবেনঃ জংগল ঘেরা এই গ্রাম থেকেই চলে যেতে পারেন পঞ্চলিঙ্গেশ্বর, ক্ষীরচোরা গোপীনাথ বা ২০ কিমি দুরের বারিপদা। বারিপদায় জগন্নাথ অম্বিকা মন্দির বা চিল্কার সৌন্দর্্য্যব উপভোগ করতে পারেন। চলে যেতে পারেন সিমলিপালের টাইগার রিজার্ভ ফরেষ্টেও।

মাথায় রাখুনঃ নভেম্বর থেকে জুন আসা যায় লুলুং-এ। লুলুং-এ ইলেকট্রিক আসেনি। সৌর-বিদ্যুতেই কাজ হয়।  তাই সাথে মোবাইল বা ক্যামেরার একষ্ট্রা ব্যাটারী রাখা ভালো। ক্যামেরার একষ্ট্রা মেমরী কার্ড আর টর্চের প্রয়োজন পড়বেই। আর সাথে রাখুন দূরবীন, উড়ন্ত পাখির ঝাঁক নজরে আনার জন্য।

Spread the love