শুধুই শাশুড়ি নয়, হয়ে উঠুন বউমার বন্ধু

Life24 Desk   -  

যুগ-যুগান্তর থেকে শাশুড়ি-বউমা সম্পর্ক মানেই একটা অদ্ভুত চিন্তাধারা মানুষের মনের মধ্যে বাসা বেঁধে রয়েছে। যা সম্পূর্ণ নেগেটিভও নয়, আবার পুরোপুরি পজিটিভও নয়। একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসাবে শাশুড়ি-বউমার সুনাম বা দুর্নাম নতুন কিছু নয়। অফিসের গসিপে, বিয়েবাড়ির জমাটি আসরে, বন্ধুদের আড্ডায় বা পাড়ার মহিলাদের পিএনপিসিতে যেখানেই বলুন না কেন, শাশুড়ি-বউমার ঝগড়া এক ধরনের মুখরোচক টপিক হিসাবে ব্যবহার হয়। আর যদি বলেন অ্যাগ্রেশনের পাল্লা কার দিকে ভারী, তাহলে চোখ বুজে শাশুড়ির নামই উঠে আসে। কিন্তু ব্যাপারটা কি আসলে তাই? শাশুড়ি বউমার বন্ধুও তো হয়ে উঠতে পারেন। বলতে গেলে ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ শাশুড়ি-বউমার সম্পর্ক বিশেষ ভালো থাকে না। আর এর কারণ হতে পারে কমিউনিকেশন গ্যাপ বা একে অপরকে বোঝার অনিচ্ছা। তাই আমাদের আজকের প্রতিবেদন ওই মহিলাদের নিয়েই যিনি নিজেদের শুধু  বলেই দম্ভ নিয়ে চলেন।

প্রথমেই চিরাচরিত  ডেফিনেশনের নাগপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করুন। ভাবুন, আপনার শাশুড়িও যদি এমন অহংকার নিয়ে আপনাকে কষ্ট দিতেন, আপনার কেমন লাগত? শাশুড়িকে মন থেকে শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা দিতে পারতেন আপনি? যদি এর উত্তর  হয় তাহলে আপনি কি চাইবেন আপনার বউমারও আপনার সম্পর্কে একই ধারণা থাকুক? তাই শুধু শাশুড়ি নয়, বউমার সঙ্গে বন্ধুর মতো ব্যবহার করুন। যেখানে আপনার যা ইচ্ছা তা বলার অনুমতি তো থাকবেই, পাশাপাশি বউমাও যেন আপনাকে মনের কথা খুলে বলতে পারে। দেখবেন এতে মনোমালিন্য তো মিটবেই, আপনি নিজেও অনেকটা এনরিচড হবেন। অন্যদিকে, আপনার জীবনের প্লাস-মাইনাস শেয়ার করার জন্য বউমাও নিঃসঙ্কোচে হাত বাড়িয়ে দেবে।

বন্ধুত্ব পাতানোর জন্য এবার একটু অতীতে ফিরে যান। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে আপনার প্রথমদিন, এরপর ক্রমশ হোঁচট খেয়ে সংসারের দায়িত্ব নেওয়া, কত ছোটখাটো সমস্যার মুখোমুখি হওয়া ইত্যাদি মনে করুন। হ্ঁযা, এখনই হয়তো ভাববেন যে এটাই তো স্বাভাবিক, নতুন কিছু নয়। সত্যিই তাই। কিন্তু এই মানিয়ে-গুছিয়ে নেওয়ার পথে আপনি তো একাই ছিলেন, তাই না? প্রথমবার খাবার পুড়ে যাওয়া, সন্তানের অসুখ বা স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যের সময় নিশ্চয়ই আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছেন? এই একই ঘটনা যদি আবার রিপিট হয় ভালো লাগবে আপনার? আপনি আপনার মনের কথা কাউকে বলতে পারেননি বলে আপনার বউমাও একই কষ্ট পাক এটা কি চান আপনি? তাহলে এবার আপনার পালা ছবিটা বদলে দেওয়ার।

মূলত, পাত্রের মায়েরা যতই আধুনিক হোক না কেন, তাঁদের মনে বউমা বলতে একেবারে রূপে-গুণে পারফেক্ট একটা মেয়ের ইমেজ থাকে। এমন একজন, যে বাড়ির আদর্শ প্রতিনিধি হবে। যার উপর বাড়ির সম্মান বজায় রাখার গুরুদায়িত্ব থাকবে। আর বিশেষ করে যার উপর সহজেই দোষারোপ করলেও তার মুখ থেকে কোনও কথা বেরোবে না। তাই পান থেকে চুন খসলেই শুরু হয়ে যায় খুঁত ধরা। বলতে পারেন, শাশুড়ি-বউমার সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে এই দোষারোপ করার ব্যাপারটা। বন্ধু হতে হলে প্রথমেই এই কারণে-অকারণে বউমার সমালোচনা বা খুঁত ধরা বন্ধ করুন। সমালোচনা করুন কিন্তু বন্ধুর মতো। বকা নিশ্চয়ই দেবেন, কিন্তু নিজের সঙ্গে তুলনা করবেন না। কারণ, বউমা থাকাকালীন আপনিও নিশ্চয়ই এমন ছোটখাটো ভুল করেছিলেন। একদিনেই তো আপনি পারফেক্ট শাশুড়ি হয়ে যাননি? নিজের ব্যবহারে নিজের পরিচয় দিন, দেখবেন এতে বউমাও ঠান্ডামাথায় আপনার নির্দেশ অনুসরণ করবে।

অন্যদিকে, সময়ের সঙ্গে মানুষের লাইফস্টাইলও অনেক পাল্টে গেছে। আগেকার বউমারা সারাদিন খাটুনির পর বিকেলে পাড়ার বউদের সঙ্গে আড্ডা জমাতেন। সন্ধ্যায় তেমন কোনও কাজ না থাকলে বসে সেলাই করতেন। কিন্তু এখন বউমারা বাড়ির কাজ করার পাশাপাশি চাকরিও করে। চাকরির ধরন বা পরিবেশও আর আগের মতো নেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই সংসারের প্যাটার্নটাও বদলে গেছে। আর একসঙ্গে দু সামলানো নিশ্চয়ই হাতের মোয়া নয়। এই পরিবর্তনটা স্বীকার করুন ও বোঝার চেষ্টা করুন। টানা আট-দশ ঘণ্টা অফিস করার পর বউমা কতটা ক্লান্ত হতে পারে তা ভাবার চেষ্টা করুন। এমনও হয়, অফিসে প্রচুর কাজ জমা পড়েছে এই চিন্তায় বউমার মাথা ভার, এদিকে বাড়িতে রান্নাও বাকি, এমন অবস্থায় বউমার কষ্ট বুঝুন। হাতে হাতে ওকে একটু এগিয়ে দিলে ওর যতটা না সাহায্য হবে, তার চেয়ে আপনার সম্পর্কে তার ধারণা দু ভালো হবে। আপনাকে মন থেকে ভালোবাসতে পারবে আপনার বউমাও। আপনার সামান্য সাহায্য পেলে বউমা অনেকটা নিশ্চিন্তে অফিসে কাজ করতে পারবে।

দ্বিতীয়ত, যুগের পরিবর্তনটা স্বীকার করার চেষ্টা করুন। আপনার জীবনধারা আর বউমার জীবনধারা একেবারে ভিন্ন।  করেছি, ও করতে পারবে না কেন? এই চিন্তাধারা মন থেকে মুছে ফেলুন। ভাবুন তো, আপনার যদি মেয়ে থাকে সে-ও কি আপনার জেরক্স কপি? এমন হয়তো অনেক কাজ আছে যা আপনি অনায়াসে পারেন কিন্তু আপনার মেয়ে পারে না। সে ক্ষেত্রে আপনি কী করবেন? নিশ্চয়ই মেয়েকে শেখার সুযোগ দেবেন? নাকি না পারলে তাকে কথা শুনিয়ে জর্জর করবেন? একইভাবে, বউমা যা পারে তার প্রশংসা করুন। প্রশংসা পেলে মানুষ মাথায় ওঠে না, বরঞ্চ পরের বারও প্রশংসা পাওয়ার লোভে আরও যত্ন নিয়ে কাজটা করে। হতে পারে বউমার জোরে হাসা বা কাপড় পরার ধরন আপনার পছন্দ নয়, কিন্তু সেটাই তো তার সব নয়। বউমা হয়তো আপনার মতো স্বাদের রান্না পারে না, কিন্তু অফিসে প্রোজেক্ট লিড করতে পারে। তাই কোনও ধারণা তৈরি করে নেবেন না। প্রত্যেকেরই নিজস্ব আইডেনটিটি থাকে। আপনারও, বউমারও রয়েছে। তাই নিজের মেয়ে বা অন্য কারও সঙ্গে ওর তুলনা করবেন না। বউয়ের খারাপ দিকগুলি সমালোচনা করে নয়, বন্ধুর মতো বলুন। দেখবেন এতে ও অনেক ভালোভাবে রি-অ্যাক্ট করবে। নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য নিজেরাই মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন। অকারণে এতে স্বামী, ছেলে, নাতি-নাতনিকে জড়াবেন না। মনে রাখবেন, আপনার ও বউমার মনোমালিন্য কিন্তু আপনার ছেলেকেও কষ্ট দেয়। ছেলে হয়তো মুখে কিছু বলে না, কিন্তু মা ও বউয়ের জাঁতাকলে পড়ে ছেলেরাই পেষে বেশি। বিশেষ করে, কখনওই বউমার বদনাম নিজের মেয়ের কাছে করবেন না। মনে রাখবেন, আপদে-বিপদে, সুখে-দুঃখে বউমাকেই আপনি পাশে পাবেন, মেয়েকে নয়। বউমা যেমন বিয়ের পর আপনার বাড়ির বউ, একইভাবে আপনার মেয়েও অন্য কোনও বাড়ির বউমা। মেয়ের মতোই বউমার সুখ কামনা করুন।

আর সবচেয়ে বড় কথা হল, আপনারা দুজনেই আলাদা পরিবেশে মানুষ হয়েছেন। তাই দৃষ্টিভঙ্গি বা পছন্দ-অপছন্দ ভিন্ন হতেই পারে। কিন্তু সুন্দর সম্পর্কের এসেন্স তো সেখানেই, যেখানে প্রত্যেকে নিজের মতো থেকেও একটা ইউনিটের মতো কাজ করে। বন্ধুত্বও কিন্তু সেরকম। শর্তহীন। ভালোবাসায় ভরপুর।

Spread the love