মাতৃত্ব ও স্ট্রেস

Life24 Desk   -  

একজন মহিলার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি হচ্ছে মাতৃত্ব। যত্নে, ভালোবাসায়, আদরে যে ছোট্ট একটা প্রাণ নিজের মধ্যে ক্রমশ বেড়ে ওঠে, তাকে বড় করে তোলার আনন্দই আলাদা। তার মিষ্টি হাসি, বায়নার কান্না, অভিমান… সব অনুভূতি মিলিয়েই তৈরি হয় মায়ের সঙ্গে সন্তানের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। কিন্তু মাতৃত্বের ছবিটা এক রঙে রঙিন নয়। এর মধ্যে জড়িয়ে থাকে চিন্তা, স্ট্রেস ও মন খারাপের মতো বিভিন্ন ফিলিংস। এবং এই ধরনের মেঘ জমা হয় অনেক সময় সন্তানের ভালো-মন্দের কথা ভেবে, কখনও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির জন্যে, কখনও-বা আবার নিজেরই জন্যে। প্রেগনেন্সির সময় ও তার পরে এই বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা আমরা সবাই করি। কিন্তু এই সমগ্র প্রোসেসটার মধ্যেই কোথায় যেন লুকিয়ে থাকে  নামক এক মারাত্মক ব্যাধি। কখন যে অজান্তেই আমরা দুশ্চিন্তায় ভুগতে শুরু করি, আমরা নিজেরাও হয়তো বুঝে উঠতে পারি না। অফিসের কাজের ডেটলাইন, বাড়ির সবার প্রতি কর্তব্য, তার সঙ্গে নিজের জন্যও কিছুটা সময় বের করা–ব্যালেন্সিংয়ের এই রুটিনটা হয়তো আগে মেইনটেন করা কঠিন ছিল না। কিন্তু এখন সব যেন কেমন গুলিয়ে গেছে। এখন মনে হয়, কী করে পারব সব? সময় কুলোয় না… আসলে ব্যালেন্স করার এই পুরো অঙ্কটাই মিলিয়ে ফেলা সম্ভব যদি প্ল্যানিং করার ফর্মুলাটা জানা থাকে। আর শুধু প্ল্যানিং নয়, এর জন্য চাই অ্যাডভান্সড প্ল্যানিং।

আজকাল প্রায় সব মেয়েই কেরিয়ার সচেতন। তাই বিয়েও একটু দেরিতে হয় বললেও ভুল হবে না। কিন্তু বয়স বেড়ে যাচ্ছে, প্রেগনেন্সিতে দেরি হয়ে যাচ্ছে– এই ধরনের চিন্তায় একাংশ দম্পতিকে ভুগতে দেখা যায়। কিন্তু মনে রাখবেন, যে কোনও ইনফার্টিলিটি ট্রিটমেন্ট বা শারীরিক মিলনের সময় স্ট্রেস-ফ্রি থাকাটা খুব জরুরি। কেননা, স্ট্রেসড আউট থাকলে কর্টিসল হরমোন বের হতে শুরু করে। এবং এটি ইমপ্লান্টেশনে অসুবিধার সৃষ্টি করে। কিছু ক্ষেত্রে তো ফার্টিলাইজেশনেও সমস্যা হতে পারে। দেখা গেছে, যাঁরা স্ট্রেস-ফ্রি থাকেন তাঁদের পক্ষে কনসিভ করা বেশি সুবিধাজনক। তাই অযথা চিন্তা ছেড়ে মন হালকা রাখার চেষ্টা করুন।

কনসিভ করার ক্ষেত্রে স্ট্রেস যেরকম একটা ফ্যাক্টর, তেমনই কনসিভ করার পরও নানা পর‌্যায়ে দুশ্চিন্তা লেগেই থাকে। জেনে রাখুন, অতিরিক্ত স্ট্রেস মিসক্যারেজের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই কনসিভ করার পরই ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিন। তাঁর পরামর্শমতো ওষুধ খান নিয়ম করে। এই সময় বিশ্রাম খুবই প্রয়োজন। তাই বলে সবসময় শুয়ে থাকতে হবে এমন কোনও কথা নেই। বাড়ির ছোটখাটো কাজ করতেই পারেন। কিন্তু ভারী কিছু করবেন না। আর চাকরি করবেন কি না, এই ব্যাপারটা পুরোপুরি নির্ভর করবে আপনার উপর। অফিসের পরিবেশ কেমন, সহকর্মীরা সাপোর্টিভ কি না, প্রয়োজনে ছুটি নিতে পারবেন কি না ইত্যাদি ভেবেই পা বাড়াবেন। অবশ্য সারাক্ষণ বাড়িতে বসে থাকলেও স্ট্রেসড আউট হতে পারেন। তাই মন ভালো রাখতে শপিং মল, পার্ক ইত্যাদিতে বেড়াতে যান। সিনেমা দেখতে ইচ্ছে করলে মাল্টিপ্লেক্সেও যেতে পারেন। তবে খুব সাবধান থাকবেন, ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে থাকবেন। এছাড়া, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, স্বামী বা যে কোনও কারওর সঙ্গেই মনোমালিন্য হতে পারে। কিন্তু এই সময় চেঁচামেচি করবেন না। কোনওরকম শারীরিক বা মানসিক উত্তেজনা প্রেগনেন্সির জন্য ভালো নয়। অনেক সময় স্ট্রেস একেবারে এড়িয়ে চলা যায় না। কিন্তু যতটা সম্ভব এইসব থেকে দূরে থাকবেন। মনে রাখবেন, যেভাবে আপনি যা খাচ্ছেন আপনার মাধ্যমে শিশুটিও খাচ্ছে, সেইভাবেই আপনি যা ভাবছেন বা যা ফিল করছেন তার সরাসরি এফেক্ট শিশুর উপরও পড়ে। তাই মন ভালো রাখতে, ভালো বই পড়ুন, ভালো মিউজিক শুনুন, ফুলের গাছে জল দিন… মোট কথা আপনার যা করতে ইচ্ছে করে তাই করুন, তবে যা করবেন সাবধানে করবেন। অন্যদিকে, প্রেগনেন্সির সময় বার বার ইউরিন পাস করতে হয়। রাস্তাঘাটে অনেক সময় এই নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। কেননা, অনেক জায়গাতেই প্রোপার হাইজিন বা প্রাইভেসি মেইনটেন করা হয় না। এটিও কিন্তু দুশ্চিন্তায় পড়ার অন্যতম কারণ। তাই কোথাও যেতে হলে আগেই প্ল্যানিং করে নিন। কোথায় গেলে ভালো বাথরুম থাকবে বা কারও বাড়িতে বেড়াতে গেলে পেঁৗছতে কতটা সময় লাগবে ইত্যাদি ভেবে নিন। বাচ্চার মুভমেন্ট নিয়েও আবার অনেক রকম চিন্তা বাসা বাঁধে। সাধারণত বলা হয়, বারো ঘণ্টায় বাচ্চা যদি দশবার মুভ করে তাহলেই সব ঠিক আছে। কিন্তু সবসময় তা না-ও হতে পারে। তবে মাঝে মাঝে কাউন্ট অবশ্যই করবেন। হঠাত্ করে মুভমেন্ট বন্ধ হয়ে গেলে তত্ক্ষণাত্ ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

বাচ্চা হওয়াটা মেয়েদের জীবনে এক বিশেষ অধ্যায়। দেখতে গেলে, নবজাতকের সঙ্গে একজন মহিলারও নতুন জন্ম হয়। একদিকে শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে যেমন মানিয়ে নিতে হয়, অন্যদিকে বাচ্চার দায়িত্ব সামালানোর জন্যও নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। এই ক্ষেত্রে পরিবারের লোক, বিশেষ করে স্বামীর সাপোর্ট একটা অনেক বড় ফ্যাক্টর। মায়ের সাথে বাবাও যদি বাচ্চার সামান্য দায়িত্ব নেন তাহলে মায়েরা অনেকটাই স্ট্রেস-ফ্রি থাকতে পারেন।

অন্যদিকে, আজকালকার মেয়েরা যথেষ্ট আপ-টু-ডেট। নিজেই ইন্টারনেট ঘেঁটে, বই পড়ে প্রেগনেন্সি সম্পর্কে জেনে নেন। তবে বেশি জানাও স্ট্রেসের অন্যতম কারণ হতে পারে। বাচ্চকে কেন্দ্র করেই মায়ের অ্যাংজাইটি লেভেল বাড়তে শুরু করে আর এর থেকেই জন্ম নেয় স্ট্রেস। তাই অহেতুক চিন্তা বাদ দিয়ে খুশি থাকার চেষ্টা করুন। আর অনলাইনে তথ্য জানার পরিবর্তে  গুগল থেকেও অনেক তথ্য জানতে পারবেন। মানে বলছি বাড়ির মা-ঠাকুমার কথা। তাঁরাও কিন্তু গুগলের চেয়ে কোনও অংশে কম নন। আগেকার দিনে যখন ইন্টারনেট ছিল না, তখন এঁদের পরামর্শ মেনেই সুস্থ বাচ্চার জন্ম দিতেন মহিলারা।

হ্ঁযা, মানছি বাচ্চা হওয়ার পর জীবনটা সত্যিই পাল্টে যায়। প্রথম কয়েক বছর বাচ্চাই জীবনের কেন্দ্রে থাকে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, আপনার নিজস্ব কোনও জগত্ থাকতে নেই। শুধু স্বামী, সংসার আর সন্তান নিয়েই জীবন সীমাবদ্ধ থাকবে, এটা কেউ চান না। আসলে জীবনের প্রতিটা পর‌্যায়ের একটা আলাদা মাহাত্ম্য থাকে। এক-এক সময় আমাদের এক-একরকম ভূমিকা পালন করতে হয়। আর প্রত্যেকটা ভূমিকারই একটা আলাদা সৌন্দর‌্য, আলাদা গুরুত্ব থাকে। সেটাকে অস্বীকার করার মধ্যে কোনও আনন্দ নেই। বাচ্চা হলে, সে যে আপনার জীবনের অনেকটা জুড়ে থাকবে এটা জানা কথা। আর সেটাকে খোলাখুলি গ্রহণ করার মধ্যেই আপনার আপনার আর বাচ্চার সম্পর্কের রসায়ন লুকিয়ে আছে। তবে যদি মনে করেন, সে সময় সেই দায়িত্ব নিতে আপনি রাজি নন, তাহলে কনসিভ করার আগেই দশবার ভাবুন।

কনসিভ করার পর নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে, মানসিক অস্থিরতায় ভুগে নিজের সঙ্গে একটা নিষ্পাপ প্রাণকে শাস্তি দেওয়ার কোনও অর্থ নেই। বরং জীবনের বদলে যাওয়া রূপটা হাসিখুশি অ্যাকসেপ্ট করুন। বাচ্চার জন্যে তো বটেই, আপনার জন্যেও সেটা হবে একটা পজিটিভ স্টেপ।

Spread the love