বাংলা সাহিত্যিকরা আজও উপযুক্ত মর্যাদা থেকে বঞ্চিত: পিনাকী ঠাকুর

Life24 Desk   -  

Life24: সাম্প্রতিক কালের সাহিত্যচর্চা নিয়ে কী বলবেন?

পিনাকী ঠাকুর: বর্তমানে যে ধরনের লেখা বেরচ্ছে গদ্য, পদ্য অর্থাত্ কবিতা, কথা সাহিত্য বেশির ভাগটাই বেশ পরীক্ষামূলক লেখক। অনেক কমবয়সি ছেলে-মেয়েরা বেশ ভালো লেখালিখি করছেন। এই বিষয়টা আমার কাছে বেশ উত্সাহব্যঞ্জক বলেই মনে হয়।

Life24: এখনকার সাহিত্যচর্চার সঙ্গে দশ বছর আগের সাহিত্যচর্চা কতটা পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করছেন?

পিনাকী ঠাকুর: এই ব্যাপারটা যাঁরা স্ট্যাটিসটিক্যাল বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন তাঁরা ভালো বলতে পারবেন, এইভাবে তো বলা যায় না, তবে আমার মনে হয় এখন বিজ্ঞান-প্রযুক্তির একটা বিরাট পরিবর্তন হয়েছে বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার, সেই পরিবর্তনের প্রভাব সাহিত্যের উপর অবশ্যই পড়েছে।

Life24: সেটা কীরকম?

পিনাকী ঠাকুর: যেমন আমরা প্রত্যেকেই ফেসবুক, ই-মেল, ট্যুইটার, ওয়াটসঅ্যাপ এইগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এর প্রভাব আমাদের জীবনে পড়েছে। সাহিত্য রচনা একটা সামাজিক কাজ। আমাদের বাস্তবজীবনে যা ঘটে, কথা সাহিত্যে তার তো একটা প্রতিফলন ঘটে, সরাসরি ঘটে না বা অনুকরণ করা হয় না, কিন্তু প্রতিফলন থাকে। শুধু কথা সাহিত্যে নয়, কবিতাতেও পড়ে, যদিও সেটা একটু বিমূর্তভাবে। যেমন– আমি হয়তো একটা গল্প পড়ছি, দেখলাম সেই গল্পের নায়ক ই-মেল করছে বা কোনও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে। দশ বছর আগে এমনটা ছিল না। কারণ তখন প্রযুক্তির এতটা উন্নতি হয়নি। অর্থাত্ নতুন টেকনোলজি বা প্রযুক্তির কথা সাহিত্যে অনেকটাই স্থান করে নিয়েছে। আগামীদিনেও আরও বেশি করে টেকনোলজির প্রভাব পড়বে। আমার কবিতাতেও এসএমএস, ই-মেল-এর উল্লেখ পাই।

Life24: যে কোনও রচনাই যিনি সৃষ্টি করছেন, সেটা তাঁর ক্রিয়েটিভিটি, যিনি লিখছেন, তাঁর লেখা বিক্রি করে প্রকাশকরা ব্যবসা করছেন, কিন্তু যাঁরা লিখছেন দিনের শেষে তাঁরা কি সঠিক মূল্য/সাম্মানিক পাচ্ছেন?

পিনাকী ঠাকুর: দেখুন আমাদের দেশে যিনি সাহিত্যরচনা করেন, সেটা তাঁর প্রোফেশন হতে পারে এইভাবে কেউ ভাবেন না। যেমন আমি শুনেছি বা পড়েছি ইউরোপ, আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে একজন ইঞ্জিনিয়ার, একজন ডাক্তারের পাশাপাশি একজন সাহিত্যিককেও প্রোফেশনাল বলা হয়। ওখানকার লেখকদের প্রকাশকরা আগে থেকেই মোটা অঙ্কের একটা টাকা দিয়ে দেন, ফলে তিনি সময় নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে লিখতে পারেন। এমনকী তাঁর লেখায় যদিও কোনও দেশ-বিদেশের বর্ণনা থাকে, প্রয়োজন হলে সেখানে গিয়ে সেখানকার তথ্য নিয়ে, সেই জাগয়টার সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে লিখতে পারেন। আমাদের এখানে হলে নিজেদের কাছে তথ্য থাকলে ভালো না হলে ইন্টারনেট থেকে দেখতে হয়। এখানে টাকা দেওয়া হলেও তার পরিমাণ অনেকটাই কম। এখানে লেখক-কবিদের প্রচুর পরিমাণে লিখতে হয়। তাঁরা শুধুমাত্র লেখার উপর নির্ভরশীল না হলেও অর্থাত্ সংসার চালানোর জন্য লেখাটা মাধ্যম না হলেও কিছুকিছু সাহিত্যিক লেখালিখি করেই সংসার চালান। আমার একজনকার কথাই মনে পড়ছে, সাম্প্রতিককালের বলব না, একটু আগের সমরেশ বসু। আমরা সকলেই তাঁকে চিনি। শুনেছি তিনি লেখার উপরই নির্ভরশীল ছিলেন। তিনি অন্য কোনও পেশায় যাননি। এটাও শুনেছি পরবর্তীকালে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বা এরকম কোনও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ভালো মাইনের চাকরির অফার পেলেও তিনি যাননি। লিখেছেন। এটা করার জন্য তাঁকে প্রচুর লিখতে হয়েছে। সারাদিন লিখেছেন। যাতে তিনি সংসার চালাতে পারেন।

Life24: আপনি মনে করেন, বিদেশে লেখকদের যে সাম্মানিক দেওয়া হয় এখানে তেমনটা হয় না?

পিনাকী ঠাকুর: একদিক থেকে দেখতে গেলে সেরকমই। ইউরোপীয় বাজারে লেখদের যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হয়, কিন্তু ভারতীয় বাজারে তেমন নয়। তবে এখন অনেক ভারতীয় লেখক ইংরেজিতে লিখছেন, এবং এমন অনেক আন্তর্জাতিক প্রকাশক রয়েছে যাদের মাল্টি ন্যাশনাল বলা হয় তাদের পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় অফিস রয়েছে এবং পাবলিকেশন রয়েছে, তাঁরা এই সমস্ত লেখকদের বই ছাপান এবং এই সমস্ত ভারতীয় লেখকরা ইউরোপীয় লেখকদের মতোই সুযোগ সুবিধা পান।

একটা জিনিস খুব অবাক লাগে, বিদেশে যেমন ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো বহু দেশে শুধু এখানে নয় অসম-ত্রিপুরায় ভালো রকম বাংলা সাহিত্য চর্চা হয়। বিদেশে অনেক বাঙালিও রয়েছেন। তাঁরা বাংলায় বিভিন্ন বই, ম্যাগাজিন নিজেরাই প্রকাশ করেন। চর্চার দিক থেকে কোনও খামতি পড়ে না। কিন্তু টাকার অঙ্কের দিকটা এমন গোলমেলে কেন সেটাই বুঝতে পারি না। বাংলা ভাষার একটা ঐতিহ্য রয়েছে। আমরা রবীন্দ্রনাথ পড়েছি, জীবনানন্দ দাশ পড়েছি, এই সেদিনও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন। আমাদের ছেলে-মেয়েরা একটু ছোট বয়স থেকেই কিছু না কিছু লেখার অভ্যেস করে। বড় হয়ে কেউ হয়তো লেখাকেই পেশা করে অথবা অন্য কিছু করে। কিন্তু তবুও বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে একটা বৈষম্য রয়ে গেছে।

শুনলে অবাক হবেন, প্রকাশকদের কাছ থেকে এমন কথাও শোনা যায় যে ইংরেজি ভাষায় লেখা কোনও বই এক লক্ষ কপিও ছাপা যায়, হয়তো এক লক্ষ কপিই বিক্রি হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলা ভাষায় লেখা কোনও বই এক হাজার কপি বিক্রি হওয়াটাই খুব কঠিন।

Life24: লিটল ম্যাগাজিন থেকে উঠে আসা ছেলে-মেয়েরা পরবর্তী কালে সাহিত্যের জগতে কতটা অগ্রাধিকার পায়?

পিনাকী ঠাকুর: এক্ষেত্রে বলব, বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা হয় যত পত্রিকায় তার প্রায় ৯৯ শতাংশটাই কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন। এই মুহূর্তে ব্যবসায়িক বড় পত্রিকা কোথায়? একটা সময় অনেক ছিল। প্রবাসী ছিল, ভারতী ছিল, ভারতবর্ষ ছিল। কিন্তু এখন দু-তিনটে পাক্ষিক বা মাসিক পত্রিকা ছাড়া যতটুকু সাহিত্য চর্চা সবটাই লিটল ম্যাগাজিন। আবার এই লিটল ম্যাগাজিনেও দু ভাগ রয়েছে। কিছু লিটল ম্যাগাজিন অল্প বয়সি ছেলে-মেয়েরা করছে। আবার কিছু বেশ বড় আকারের লিটল ম্যাগাজিন যেমন এক্ষণ, পরিচয় বা কৃত্তিবাস এদের যা স্ট্যান্ডার্ড তা কোনও ব্যবসায়িক পত্রিকা থেকে কিন্তু কোনও অংশে কম নয়। এরা লিটল কারণ এরা বেশি ছাপতে পারে না, সার্কুলেশন কম, ফলে কম লোকের কাছে পৌঁছয়। এদের মার্কেটিংটা ঠিক ভাবে হয় না। একটা কথা সত্যি যাঁরা সাহিত্য চর্চা করেন তাঁদের প্রধান বাহনই কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন। অনেক বড় সাহিত্যিক যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ এঁরা প্রত্যেকেই বড় পত্রিকায় লেখালিখি করার পাশাপশি লিটল ম্যাগাজিনে লেখালিখি করেছেন, সম্পাদনার কাজে যুক্ত থেকেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন ১৯ বছর বয়স থেকে আমৃতু্য কৃত্তিবাস-এর সম্পাদনা করেছেন। সুতরাং লিটল ম্যাগাজিনের স্থান কিন্তু সবার ওপরে বলেই আমার মনে হয়।

Spread the love

আপনার প্রিয় ওয়েব ম্যাগাজিন ‘Life24’-এ আপনিও লিখতে পারেন এই ম্যাগাজিনের উপযুক্ত যে কোনও লেখা। লেখার সঙ্গে পাঠাবেন উপযুক্ত ২-৩টি ফটো। লেখা পাঠাবেন ইউনিকোডে টাইপ করে। ইউনিকোড ছাড়া কোনও লেখাই গ্রহণ করা হবে না। লেখা ও ফটো পাঠাবেন editor.life24@gmail.com আইডি-তে। কোন সেগমেন্টের লেখা পাঠাচ্ছেন, তা মেলের সাবজেক্টে অবশ্যই লিখে দেবেন। আর অবশ্যই মেলে আপনার নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর জানাবেন।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে খুব কম খরচে আপনার পণ্য কিংবা সংস্থার বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন। বিস্তারিত জানার জন্য মেল করুন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে ৩১ মার্চ পর্যন্ত আপনি একেবারেই বিনামূল্যে দিতে পারবেন শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন। এই বিভাগের যে কোনও সেগমেন্টের জন্য ৫০ শব্দের মধ্যে ইউনিকোডে লিখে মেল করে দিন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।  মেলের সাবজেক্টে লিখে দেবেন 'শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন'।

# 'Life24' ওয়েব ম্যাগাজিন বা এই ওয়েব ম্যাগাজিনের লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত লিখে জানান নিচের কমেন্ট বক্স-এ। আর হ্যাঁ, ম্যাগাজিনটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার পরিচিতদের।