সুন্দরী সিকিমের নাথুলা পাস

Life24 Desk   -  

মেহেদি হাসান মোল্লা

জীবনের প্রথম বড় ট্যুর। তাও আবার বন্ধুদের সঙ্গে। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। পরের বছরে পাহাড় পরিমান চাপ বেড়ে যায় সঙ্গে দায়িত্বও। একটু হাওয়া বদল দরকার। নাহলে যেন একঘেঁয়েমি বাসা করে মনে। শুরু হল প্ল্যানিং। এ প্ল্যানিং আবার যেমন-তেমন নয়। ইন্টারনেট থেকে শুরু করে পূর্বের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষ জন সবার থেকে সাজেশন নেওয়া শুরু। অন্তন ২ মাস আগে থেকেই। শেষমেশ ভ্রমণের জায়গা ঠিক হল। অনেকদিনের সখ ছিল পাহাড়ে চড়ার। একটু মেঘেদের সঙ্গে খুনসুটি করার। বরফস্তুপের সঙ্গে কোলাকোলি করার। বেছে নিলাম সিকিম-নাথুলা পাস। নাথুলা পাসের কথা আগে বহুবার শুনেছিলাম। ভারত চিন সীমান্ত নির্ণয় করেছে এই পাস। ভ্রমণের জায়গা যখন ঠিক হয়ে গেল এবার তো সীমাহীন আনন্দ। চলে গেলাম টিকিট কাটতে। কিন্তু আনন্দটা যেন ক্ষীণ হয়ে গেল। টিকিট পেলাম ওয়েটিং লিস্টে। আমরাই হয়তো একটু দেরী করে ফেলেছিলাম। ২ মাস আগে থেকেই টিকিটের ভাঁড়ারে যে টান পড়বে ভাবতে পারিনি। যাই হোক চাপা আনন্দে কিছুদিন কাটানোর পর হঠাৎ যেন তা ব্লাস্ট করে গেল! মেসেজ পেলাম টিকিট কনফার্ম। আনন্দ আর চাপা রইল না। মনে হচ্ছিল পাহাড়েই চলে এসেছি তখনই। মাস দুই ধরে চলল বিভিন্ন কেনাকাটা, ভাবনা, পরিকল্পনা। যত দিন কাছে আসতে লাগল ততই আনন্দের পারদ লাফিয়ে বাড়তে লাগল। অবশেষে ট্রেন ধরার দিন চলে এলো। ব্যাগপত্র গুছিয়ে ছয় বন্ধু হাজির শিয়ালদহ স্টেশানে। ট্রেনে উঠেই হাসি আড্ডা তো লেগেই ছিল সঙ্গে খাওয়া দাওয়া। পাশের যাত্রীদের একটু অসুবিধার কোন তোয়াক্কা না করে জোর কদমে আমাদের আড্ডা চালিয়ে গেলাম। আমাদের হাত থেকে রেহাই পেলেন না টিকিট পরীক্ষকও। মজা করে বলেছিলাম টিকিট নেই। যা প্রতিক্রিয়া দেখলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমাদের সঙ্গে সহযাত্রীরাও এই মুহূর্তটা বেশ উপভোগ করলেন। তারপর সারা রাতটা কাটল গল্পের মধ্য দিয়ে। কাকভোরে নামলাম নিউজলপাইগুড়ি স্টেশনে।

নর্থ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজে কিছু বন্ধুর আবদারে সেখান থেকে একটু উঁকি দিয়ে এলাম। সেইদিনের ক্লান্তিটা শিলিগুড়ি শহরেই জুড়িয়ে নিলাম। পরের দিন সকালেই বেরিয়ে পড়লাম বহু কাঙখিত সেই স্থানের উদ্দেশ্যে। শিলিগুড়ি থেকে একটি গাড়ি সহ হোটেল প্যাকেজ করে নিলাম। প্যাকেজ ট্যুরের একটি সুবিধা হল গাড়ি, হোটেল, খাওয়া-দাওয়ার কোনও চিন্তা মাথায় নিতে হয় না। সবকিছুর দায়িত্ব থাকে ট্যুর অপারেটরদের কাছে। যাত্রা শুরু হল। তার সঙ্গে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে ছুটে চললাম প্রতিবেশি এক রাজ্যে। রাস্তার দুপাশে শাল, পাইনের বন। কোথাও আবার চায়ের ক্ষেতে শ্রমিকরা চা পাতা তুলতে ব্যস্ত। সবুজের সমারোহে নতুন সূর্যের আভা মেখে পৌঁছে গেলাম তিস্তার তীরে। প্রকৃতি যেন তার দু-হাত ভরে শোভা দিয়েছে তিস্তার প্রান্তে। তিস্তার পাড় দিয়ে গাড়ি চলছে। পাশেই দৈত্যাকৃতি সব পাথরের স্তুপ দাঁড়িয়ে। তিস্তার বুক দিয়ে অনবরত কলকল শব্দে বয়ে চলেছে বরফ গলা জলের স্রোত। এমনই ভাবে পৌঁছে গেলাম গ্যাংটক শহরে।

আস্তানা নিলাম এক হোটেলে। হোটেলে ফ্রেস হয়ে সেদিনের জন্য বেরিয়ে পড়লাম আশাপাশের কিছু জায়গা দেখতে। পাশেই ছিল এক উচ্চ ঝরনা। সেখান থেকে গ্যাংটক শহরের ওলিগলি ঘুরে দেখলাম। রাতে হোটেলের ছাদে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে আড্ডার আসর জমে উঠেছিল বেশ মজার। রাতের ডিনার সেরে ঝটপট শুয়ে পড়লাম। পরের দিন ভোরেই বেরোনোর পালা। রাতে চোখের পাতা বন্ধ হলেও মস্তিষ্ক সজাগ ছিল বুঝতেই পারছিলাম। অ্যালার্ম বাজার আগেই সবার ঘুম ভেঙেছিল। সূর্য ওঠার আগেই গাড়ির হর্ন শুনতে পেলাম হোটেলের নীচে। রেডি হয়ে গাড়িতে চড়লাম। নিস্তব্দ শহরের নিস্তব্দতা কাটিয়ে গাড়ি ছুটল নাথুলার উদ্দেশ্যে। সোম ও মঙ্গলবার বাদ দিয়ে সপ্তাহের বাকি পাঁচ দিনই নাথুলা যাত্রার অনুমতি মেলে। গ্যাংটক পৌঁছেই  দু’কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি ও এক কপি ভোটার পরিচয়পত্রের জেরক্স দিয়ে আবেদন করলে সহজেই মেলে এই অনুমতিপত্র। হোটেলে জমা দিলে তারাও আনিয়ে নিতে পারে অনুমতিপত্র। আমরা এই দায়িত্বটা হোটেলের উপর ছেড়েই দিয়েছিলাম। সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক। প্রায় ৫০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই সাজানো শহর। গ্যাংটকের চারিদিকে তুষার আবৃত খাড়া সুউচ্চ পাহাড়গুলো দন্ডায়মান। যেতে যেতে অনুভব করলাম মহিমাম্বিত হিমালয়ের পাদদেশে রুপের ডানা মেলে থাকা ছোট এক রাজ্য সিকিম। ছবির ন্যায় নিখুঁত একটি গন্তব্যস্থল। আকর্ষণীয় আলপাইন সৌন্দর্যের জন্য অনেকে “সুইজারল্যান্ড” হিসাবে অভিহিত করেন। ছুটে চললাম বরফাবৃত পর্বতের দেশে, পুরু আলপাইন অরন্য সমৃদ্ধ প্যাঁচালো পথের উপত্যকায়।

গ্যাংটক থেকে বাবা মন্দির প্রায় ৬০ কিলোমিটার। এই যাত্রাপথে তিনটি দর্শনীয় স্থান আছে। ছাঙ্গু হ্রদ, নতুন বাবা মন্দির আর পুরনো বাবা মন্দির। গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু লেক ৩৯ কিলোমিটারের পথ। ছাঙ্গু লেকের স্থানীয় নাম সোমগো যার অর্থ সব হ্রদের উৎস। বরফে মোড়া পাহাড়ের বুকে ৫০ ফুট গভীর টলটলে জলের হ্রদ ছাঙ্গু। প্রায় ১২ হাজার ৩১৩ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের কোলে এই ছাঙ্গু লেকই লুংজে চু-র উৎস। পাহাড় ভেঙে লুংজে চু মিশেছে রাংপো চু তে। শীতকালে ছাঙ্গুর জলে বরফ জমে যায়। মেঘ ঠেলে আমরা পৌঁছে গেলাম ছাঙ্গুতে। গাড়ি থেকে নামতেই ঠান্ডায় কাঁপুনি শুরু হল আমাদের। তখন অবশ্য লেকে পুরোপুরি বরফ জমেনি। এই লেকটি পরিযায়ী পাখি আর ব্রাক্ষ্মণী হাঁসেদের বাসস্থান। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই লেক রং পরিবর্তন করে। বসন্তে হ্রদের চারপাশ রঙিন হয়ে ওঠে রডোডেনড্রন, প্রিমুলা আর নীল-হলুদ পপি ফুলে। লেকের পাড়ে গরম পোশাক, ইয়াকের দুধের চিজ, কিউরিও নানা পশরা নিয়ে বসেছে রস্থানীয় দোকানি। লেকের চাপাশে চমরি গাই চড়ে ঘুরলাম। কিছু মুহূর্ত ক্যামেরা বন্দি করলাম চমরি গাই এর সঙ্গে। এরপর চলতে শুরু করলাম বাবা মন্দিরের উদ্দেশ্যে। ছাঙ্গু থেকে বাবা মন্দিরের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। এই বাবা মন্দির কোনও দেবতার মন্দির নয়। এখানে রয়েছে একটি মানুষের দেবতা হয়ে ওঠার কাহিনি।

পঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈনিক হরভজন সিং ১৯৬৮ সালে ইন্দো-চিন লড়াইয়ে মারা গিয়েছিলেন -নাথুলা পাসের কাছে। ইন্দো-চিন লড়াইয়ে সৈনিকদের জন্য একটি টিম খাদ্য সরবরাহ করছিল অসম্ভব দুর্গম এক পথ দিয়ে। সেই দলের লিডার ছিলেন হরভজন সিং। পথে এক হিমবাহ চাপা পড়ে মারা যান তিনি। তবে স্থানীয় মানুষ থেকে সৈনিক  প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেন এখনও ভীষণভাবে হরভজন সিং বিরাজমান। তাঁদের বিশ্বাস কোনও পর্যটক বা সৈনিক বিপদে পড়লে আজও তাঁকে পথ দেখান বাবা হরভজন সিং। মৃত্যুর পরেও হরভজন সিং তাঁর কর্তব্য পালন করেছেন। সেনাবাহিনীতে তাঁর পদোন্নতিও ঘটেছে, বর্তমানে হরভজন সিং- এর পেনশন পান তার বাড়ির লোক। এই মন্দিরে লাইন দিয়ে ভিতরে ঘুরে আসতে পারেন। স্মৃতিমন্দিরে হরভজনের পোশাক, ছবি ইত্যাদি সযত্নে রক্ষিত আছে। মঙ্গল ও রবিবারে মেলে বাবার অন্নপ্রসাদ। কাছেই আছে  ২০ ফুট উচ্চতার এক ঠান্ডা জলের ঝরনা। বিরাট উঁচু পাথরের মাথা বেয়ে জল সশব্দে নিচে পড়ছে। অনেক পূণার্থী এই জলে স্নান সেরে পাশের কালি মন্দিরে পূজো দিতে যাচ্ছেন। আমারা চেষ্টা করলাম এই ঝরনার মাথায় পৌঁছনোর। ট্রেকিং এর অভ্যাস নেই কিন্তু সখ ছিল বহুদিনের। সুযোগ যখন পেলাম হাতছাড়া করি কীভাবে! সাহস ভরে উঠতে শুরু করলাম। অবশেষে প্রায় ৬০ ফুট উঁচুতে উঠে ঝরনার মাথা খুঁজে পেলাম। ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে বেশ কিছু সময় কাটালাম। এখান থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে ১৪৪৫০ ফুট উচ্চতায় নাথুলাতে রয়েছে ভারত-চীন সীমান্ত। কাঁটাতারের বেড়ার ওপারেই দেখা যাবে চিনের বাড়ি, টহলরত চিনা সেনা। সেনাদের সঙ্গে করমর্দন ও বাক্যবিনিময় করলাম বেশ কিছুক্ষণ। কাছেই আরেকটি স্পট টুকলা। এখান থেকে অসাধারণ লাগে তুষারে ঢাকা হিমালয়। এখান থেকে আপনি বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এবং অভিভাবক দেবতাদের ভূমি হিসাবে পরিচিত কাঞ্চনজঙ্ঘার উপর সূর্যোদয় এবং আলোকরশ্মির একটি সুবর্ণ রঙের ধারা দেখতে পাবেন। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও ফেরার ডাক উঠল।

কীভাবে যাবে:- শিয়ালদহ , হাওড়া কিংবা কলকাতা স্টেশন থেকে ছাড়া উত্তরবঙ্গগামী যে কোনও ট্রেনে এসে নামতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি (এনজেপি) স্টেশনে। সেখান থেকে গ্যাংটকের দূরত্ব ১২৫ কিলোমিটার। আবার বিমানে বাগডোগরায় পৌঁছে সেখান থেকেও চলে আসতে পারেন গাড়িতে করে গ্যাংটকে।

থাকবেন কোথায়:- সিকিম টুরিজমের কিছু সরকারি লজ আছে। এছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি নামি-দামি হোটেল,গেস্ট হাউস, লজ পাওয়া যাবে।

কখন যাবেন:- শীতের শুরুতেই অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বরে যাওয়া সবথেকে ভালো। বেশি শীতে রাস্তায় বরফ থাকার কারণে গাড়িতে যেতে অসুবিধা হয়।

কী করবেন না:- নাথুলা পাসের বর্ডারে ছবি তোলা নিষেধ। বরফ জমা পাহাড়ে ট্রেকিং করার সময় পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সঙ্গে কী রাখবেন:- সঙ্গে করে নিতে পারেন প্রয়োজনীয় ঔষধ। গরমের পোশাক নিতে একদম ভুলবেন না।

Spread the love