বারানসীর অলিতে গলিতে

Life24 Desk   -  

সুকুমার পণ্ডিত

বেনারস বেড়াতে যাবো এমন ইচ্ছে আমার কস্মিনকালেও হয়নি। সিনেমায়, ফটোগ্রাফিতে যখন বেনারস দেখেছি মনে হয়েছে বটে যে রঙের সাম্রাজ্য, হাজার হাজার প্রদীপের আলোয উজ্জ্বল এক শহর হল বেনারস। কিন্তু এ ধারণা স্পষ্ট ছিল যে এই শহর মানেই থিকথিকে ভিড়, সরু রাস্তা, কান ফাটানো চিত্কার, গানের জগঝম্প, ছাই মাখা সাধু, ষাঁড়, ঠেলা গাড়ি, শয়ে শয়ে রিক্সা, টু্যরিস্টের দামি ক্যামেরা আর কামানের মত দেখতে লেন্স ঝুলিযে হাঁটা, খাস বেনারসি পুরুত পান্ডার পান খাওয়া ঠোঁটে শুদ্ধ হিন্দি, গায়ে উঠে পড়া মোটর সাইকেল, গাড়ি, হোটেলের দালাল আর নৌকার মাঝি। ফলে কখনও ভাবিইনি যে বেনারস দেখতে যাব।

কিন্তু আমার এক বিদেশি বন্ধু, পিটার বেনারস নিয়ে তাঁর ভীষণ কৌতুহল জানালেন। শুধু জানালেন না আমায নিয়ে পাড়ি দেওযার সমস্ত পরিকল্পনা সেরে ফেললেন। আমি আর কী করি? বাধ্য হয়ে ব্যাগ গুছিযে পুজোর পরে এক মনোরম দিনে শিয়ালদহ থেকে সম্পর্ক ক্রান্তি এক্সপ্রেসে রওনা দিলাম। দুপুরে বেড়িয়ে রাতে পৌঁছানো। সেও অন্যদিক থেকে ফ্লাইট করে রাতেই পৌঁছাবে। দশাশ্বমেধ ঘাটের পাশেই নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের হোটেল পাওযা যায়। সেখানেই আমাদের হোটেল বুক করা ছিল। রাতে বিশ্রাম নিয়ে পর দিন থেকে ঘোরা।

প্রথমে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। জেনেছি প্রাচীন মন্দির ধবংস হয়ে যাবার পর বর্তমান মন্দিরটি নির্মান করেন ইন্দোরের মহারানি অহল্যাবাঈ হোলকর (১৭৭৭ সাল)। পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিত সিঙ প্রায় সাড়ে আটশো কেজি ওজনের সোনার পাতে মন্দিরের উপরের অংশ মুড়ে দেন। সকাল সকাল সংকীর্ণ গলিপথে মন্দিরে প্রবেশের সময়ে পান্ডারা ছেকে ধরল। শুধুমাত্র দর্শন করাবার জন্য যে আমি ২০ টাকার বেশি দিতে রাজি নই সে ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বলার চেষ্টা করলাম কিন্তু পিটার সঙ্গে আছে তাই সে উপায় নেই। তারা ছাড়বেই না। আমি তো বিরক্তই হচ্ছিলাম। আধ্যাত্মিকতা আমার মনে নেই। তবু দর্শন সারলাম।

একই গলিতে অন্নপূর্ণা মন্দির। তাও দেখলাম। এখানে পিটার জানাল যে পেশোয়া বাজিরাও ১৭২৫ সালে এই মন্দিরটি নির্মান করেন। বুঝলাম তাঁর হোমওয়ার্ক প্রচুর। কাশীর কাশীবিশ্বনাথ মন্দিরের গায়ে আছে ঔরঙ্গজেবের তৈরি বিতর্কিত বেনীমাধব কা দারেরা নামে মসজিদ। এসব ঘুরতে ঘুরতে সকাল দুপুর হল। এবার লাঞ্চ সারার ইচ্ছে হল। সত্যি বলতে কি, বেনারসে সাধারনত আর পাঁচটা হিন্দু তীর্থস্থানের মত আমিষ নিরামিষের ছুতমার্গ নেই। যদিও রাস্তায় রাস্তায যা বিক্রি হয তার বেশিরভাগই নিরামিষ। আমিষ রয়েছে বটে, তবে একটু রেখে ঢেকে। আমরা ঘুরতে ঘুরতে নানারকম খেয়ে চলছিলাম। তার মধ্যে প্যাঁড়া, লস্যি, পান, ডিম সেদ্ধ সবই আছে। লাঞ্চটা নিরামিষ ভাতই হল। পিটারও সুন্দর চামচ সহযোগে ভাত ডাল তরকারি খেয়ে নিল।

এবার একটু ঘাট দর্শনের ইচ্ছে। বেনারসের গঙ্গা আরতি, পান আর লস্যি যেমন বিখ্যাত, তেমন বিখ্যাত রঙিন গলিগুলো। কী নেই এখানে? গান আছে, কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ফটোগ্রাফার আছে, জিলিপি, রাবড়ি, আর গরম কচুরি কিম্বা গাজরের হালুযা, কিছু বিশালাকৃতির ষাঁড়ও আছেন। দিব্যি নিশ্চিন্তে ঘুরছেন এদিক ওদিক। একটু ক্লান্ত হযে পড়লে রাস্তার একদম মাঝখানে বসে বসে জাবর কাটছে। ফুটপাথের চিহ্ণ আছে কিন্তু এখন সেখানে কেবলই দোকান। দশাশ্বমেধ রোড দিযে গাড়ি চলা নিষেধ। তবুও এত ঠেলাঠেলি! গাড়ি চললে কী হত কে জানে! রাস্তার মাঝামাঝি লোহার রেলিং দিয়ে রাস্তা ডাইনে বাঁযে ভাগ করা। রেলিঙের ধার ঘেঁসে দাঁড়িয়ে এক গাদা ঠেলাগাড়ি। তাতে সাজানো হরেক রকম জিনিস। তাতে আছে জিলিপি, আমসত্ত্ব, পেঠা বা কুমড়োমেঠাই, বাদাম ভাজা, চুড়ি, জামাকাপড় আরো কত কী! দশাশ্বমেধের দিকে যত এগোচ্ছি, ততই দোকানের পরিসর ছোট হচ্ছে আর বৈচিত্র বাড়ছে। রাস্তা সরু হয়ে সোজা গিযে পড়েছে ঘাটে। রাস্তা নোংরার বেহদ্দ। তবে ঘাটে যাবার এটাই সোজা রাস্তা। আর একটা রাস্তা ডান দিকে ঘুরে গেছে। সেদিকটায় বেশ বাজার মতো। দুধারে মনিহারি দোকান সাজানো। রাস্তার মুখেই গোটাকতক পানের মশলার দোকান। এমন তার জাঁক জমক, দেখলে মনে হয় যেন গয়নার দোকান। যাই হোক, হাজার বিরক্তি নিযে পৌঁছালাম ঘাটের সিঁড়িতে। সিঁড়ির ঠিক সামনেই একটা ছোট্ট মন্দির। ভেতরে হনুমানের মূর্তি।

এতক্ষনের চেনা রাস্তার সঙ্গে কিন্তু ঘাটের কোনো মিল নেই। এখানেও মানুষ অনেক আছে। বাঙালি পরিবার, খাস বেনারসের লোকজন, লামা, জাপানি ট্যুরিস্টের দল, আমেরিকান, আরবি, পাঞ্জাবী, সাধু, আধা-সাধু, সাধু সাজা ভন্ড, দালাল, ভিখিরি, দোকানদার, ফুল ওয়ালি, নাপিত, পুরোহিত আরো কত কে! কেউ এসেছে ভক্তির জন্যে আবার কেউ এসেছে গঙ্গা স্নানে। বেশিরভাগের লক্ষ্য পূণ্য অর্জন। এর পর রয়েছে ফোটোগ্রাফারের দল। বিশালাকৃতির ক্যামেরা ভীষনদর্শন লেন্স নিয়ে তারা চারিদিকে ভনভন করছে। একটু রঙচঙে সাধু, উদাস ভিখিরি বা ষাঁড় দেখলেই তারা ময়রার দোকানে মাছির মতো ভিড় করে ঠেলাঠেলি করে ছবি তুলছে। ঘাটও একটা ব্যবসাক্ষেত্র। দোকানি, পুরোহিত, দালাল, মাঝি, নাপিতের দল আগন্তুক গোষ্ঠীর পথচেযে আছে দু পযসা রোজগারের জন্যে। ঘাটের সিঁড়িতে মাঝে মধ্যেই একটা করে চত্ত্বর মতো করা। সেখানে চৌকি পাতা। কিছু জায়গায় বাবাজিরা সেগুলো দখল করে আছেন। কিছু ফাঁকা। বসলে কেউ কিছু বলে না। আমরা এরকমই একটা খুঁজে নিযে একটু বসলাম। বিকেল গড়িযে চোখের সামনে সন্ধ্যে নামল। ভিড় বাড়ছিল। সকলের মধ্যেই উচ্ছ্বাস আর উত্তেজনা। আমার মন তখন স্থির। ঘাটের সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে গঙ্গার জল পর‌্যন্ত। ঠিক এইখানে এসে, বেনারসের যাবতীয হই হট্টগোল থেমে যায়। এর সীমানা এই পর্যন্ত। এর পরেই আবহমানকালের গঙ্গা। হাজার বছর ধরে এইভাবে বয়ে চলেছে। শত পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে এই দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আমার মনের সব কোলাহল, পিটার আর আমার সব কথপোকথন যেন থেমে গেল। আমার বেনারস আসার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হযে উঠল।

সন্ধ্যে নামে। আস্তে আস্তে আলো জ্বলে ওঠে। ঘাটের ধাপগুলোতে লোকজন এসে বসতে থাকে। ফুলওয়ালিরা পুজোর ডালি নিয়ে ঘুরছে। একটা ছোট্ট চ্যাঙাড়ি, তাতে গোটা কয়েক ফুল, একটা ছোট্ট প্রদীপ। লোকে প্রদীপ জ্বেলে গঙ্গায় ভাসিযে দেয়। এ হলো সন্ধ্যার গঙ্গা পূজো। আরম্ভ হল গান, তালে তালে ঘণ্টা। কোথা থেকে পুরোহিতরা জড়ো হলেন। হাতে একটা বড় আঙটা, যাতে কর্পুরের আগুন জ্বলছে। আঙটার মাপ প্রায় আমাদের ভাত খাবার থালার মতো। এভাবে আরম্ভ হল আরতি। পুরোহিতরা নেচে নেচে আরতি করছেন জ্বলন্ত আঙটা হাতে নিয়ে প্রত্যেকের এক ভঙ্গি, এক মুদ্রা একই পদক্ষেপ।

এখানে বসেই রাত নামল। সময় হল হোটেল ফেরার। পরদিনের পরিকল্পনা অনেক। বেনারসের অন্যতম আকর্ষণ ৭টি ঘাট। সেগুলোতে ঢুঁ মারা, আরও দুটো মন্দির দেখা। এছাড়া গঙ্গার অন্য পারে রামনগর ফোর্ট ও মিউজিযাম দেখা ছিল কাজ। এটা  বারানসীর  অতীত রাজাদের দুর্গ। এখানকার মিউজিযামে দেখা গেল রাজাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন আমলের ঘোড়ার গাড়ি, পালকি, চৌদোলা, কারুকার‌্যমন্ডিত হাওদা, পোশাক পরিচ্ছদ, অভিনব ঘড়ি, প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। এছাড়া দুর্গের একটা অংশে রামনগরের বিখ্যাত রামলীলার কিছু দৃশ্যের ফটোগ্রাফ ছিল। এ অভিজ্ঞতাও ভালো। কিন্তু সন্ধ্যায় আবার ঘাটে এসে বসলাম। কালো জলে প্রদীপের আলোর ঝলমলানি যতই দেখে যাই মন ভরে না। তাই অতৃপ্ত মন নিয়ে একসময হোটেলে ফিরলাম। পরদিন আবার যে যার জায়গা ফিরে যাওয়া।

Spread the love

আপনার প্রিয় ওয়েব ম্যাগাজিন ‘Life24’-এ আপনিও লিখতে পারেন এই ম্যাগাজিনের উপযুক্ত যে কোনও লেখা। লেখার সঙ্গে পাঠাবেন উপযুক্ত ২-৩টি ফটো। লেখা পাঠাবেন ইউনিকোডে টাইপ করে। ইউনিকোড ছাড়া কোনও লেখাই গ্রহণ করা হবে না। লেখা ও ফটো পাঠাবেন editor.life24@gmail.com আইডি-তে। কোন সেগমেন্টের লেখা পাঠাচ্ছেন, তা মেলের সাবজেক্টে অবশ্যই লিখে দেবেন। আর অবশ্যই মেলে আপনার নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর জানাবেন।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে খুব কম খরচে আপনার পণ্য কিংবা সংস্থার বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন। বিস্তারিত জানার জন্য মেল করুন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।

Life24 ওয়েব ম্যাগাজিনে ৩১ মার্চ পর্যন্ত আপনি একেবারেই বিনামূল্যে দিতে পারবেন শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন। এই বিভাগের যে কোনও সেগমেন্টের জন্য ৫০ শব্দের মধ্যে ইউনিকোডে লিখে মেল করে দিন advt.bearsmedia@gmail.com আইডি-তে।  মেলের সাবজেক্টে লিখে দেবেন 'শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন'।

# 'Life24' ওয়েব ম্যাগাজিন বা এই ওয়েব ম্যাগাজিনের লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত লিখে জানান নিচের কমেন্ট বক্স-এ। আর হ্যাঁ, ম্যাগাজিনটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার পরিচিতদের।